বাংলার ইতিহাসে সেন বংশের গুরুত্ব অপরিহার্য। এই সেন বংশের শেষ শক্তিশালী রাজা ছিলেন লক্ষ্মণ সেন (১১৭৯-১২০৬)। তাঁর সময়ে সেন সাম্রাজ্যের ভৌগোলিক বিস্তারই শুধু নয়, সাহিত্য, সস্কিৃতি, সঙ্গীত সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলার সুনাম ছড়িয়ে পড়েছিল সর্বত্র। এই গৌরবজনক অধ্যায়ের অন্যতম ধারক-বাহক ছিলেন লক্ষ্মণ সেনের রাজ দরবারের পাঁচজন বিখ্যাত মানুষ। তাঁদেরকে একত্রে বলা হতো ‘পঞ্চরত্ন’। তাঁরা হলেন কবি জয়দেব, উমাপতি ধর, শরণ, ধোয়ী এবং গোবর্ধন আচার্য। ‘গীতগোবিন্দ’র স্রষ্টা জয়দেব লক্ষ্ণণ সেনের সভাকবি ছিলেন। তাঁর রচিত ‘গীতগোবিন্দ’ সমগ্র বৈষ্ণব সাহিত্যের একটি উজ্জ্বল মাইলফলক। রাজসভার প্রশস্তি রচয়িতা ছিলেন উমাপতি ধর। তাঁরা প্রধান রচনা ‘দেবপাড় প্রশস্তি’, ‘চন্দ্রচূড়চরিতম’, ‘মাধাইনগরের প্রশস্তি’ ইত্যাদি। তাঁর রচনায় তৎকালীন সময়ের রাজনীতি, রাজতন্ত্র পরিচালনা, কূটনীতি ও সেন-রাজাদের সাম্রাজ্য বিজয় সংক্রান্ত বহু তথ্য সংকলিত রয়েছে। কবি শরণের দুরূহ ও দ্রুত পদরচনার মুন্সিয়ানার কথা একাধিকবার উল্লেখ করেছেন কবি জয়দেব। দুর্বাশা ঋষির কাহিনির উপর আধারিত কাব্য ‘দুর্বাসোপাখ্যানম’ তাঁর রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য। পঞ্চরত্ন সভার এই সদস্য সম্পর্কে অবশ্য খুব বেশি তথ্য জানা যায় না। ‘পবনদূত’ কাব্যগ্রন্থের স্রষ্টা ধোয়ী। শ্রুতিধর হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল রাজ দরবার ছাড়িয়ে গোটা সেন সাম্রাজ্যে। কালীদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যগ্রন্থের অনুসরণে তিনি ‘পবনদূত’ লিখেছিলেন। তাঁর রচনা থেকে সেন যুগের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অনেক ধারণা পাওয়া যায়। এই কাব্যে যুবরাজ লক্ষণ সেনের দাক্ষিণাত্য অভিযান কালে কুবলয়বতী নামে এক গন্ধর্বকন্যার সঙ্গে প্রণয়ের কাহিনি পরিবেশিত হয়েছে। শৃঙ্গার বিষয়ক পদ রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন গোবর্ধন আচার্য। তাঁর লেখা ‘আর্যাসপ্তশতী’ কাব্য বাংলার বাইরেও সাড়া ফেলেছিল। ‘পঞ্চরত্ন সভা’র প্রত্যেকেই পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ও ভক্তি আন্দোলনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে বলে মনে করেন পণ্ডিতরা।



