নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল: খনি ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিকদের নিরাপত্তাজনিত সংকট নিয়ে শ্রমিক নেতাদেরকেই কাঠগড়ায় তুললেন বিজেপি বিধায়ক জিতেন্দ্র তেওয়ারি। আর সেটা করতে গিয়ে বুধবার বেছে নিলেন সংঘের শ্রমিক সংগঠন বিএমএসের মঞ্চকেই। সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে জিতেন্দ্র এমন বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন, যা দলমত নির্বিশেষে শ্রমিক নেতাদের চরম বিড়ম্বনায় ফেলেছে।
এদিন পাণ্ডবেশ্বর বিধানসভার ঝাঁজরায় বিএমএসের একটি কর্মসূচিতে যোগ দেন জিতেন্দ্র। সেখানে তিনি বলেন, ‘সেফটি কমিটির প্রস্তবনা (রেজুলেশন)-এর বুকগুলিতে সেফটির কথা লেখা থাকছে না। মনে রাখবেন, সেফটি মিটিংয়ের পর সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে, দায়ী শ্রমিক নেতাও। তাঁর দায়িত্ব সেফটি কমিটির মিটিংয়ে কোলিয়ারির ত্রুটি তুলে ধরা।’ সুর চড়িয়ে তিনি আরও বলেন, ‘শ্রমিক নেতারা সেফটি মিটিংয়ে সেফটির বিষয়ে আলোচনা না করে নিজের স্বার্থসিদ্ধির আরও পাঁচটা ফাইল নিয়ে যাচ্ছেন। কোন শ্রমিককে আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উপরে কাজ করিয়ে দিতে হবে সহ একাধিক ফাইল। এই সব ফাইল সই করিয়ে নিয়ে ২-৪ লক্ষ টাকা কামিয়ে নিচ্ছেন।’
এখানেও থেমে থাকেননি বিজেপি বিধায়ক। তিনি বলেন, ‘কোলিয়ারির শ্রমিকদের হাইপাওয়ার কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী বেতন দেওয়া হচ্ছে না। শ্রমিক নেতারা কতগুলি আন্দোলন করেছেন? উল্টে শ্রমিকরা আন্দোলন করতে গেলেই শ্রমিক নেতারা তাঁদের চাপ দিয়ে কাজে যোগাদান করান। এটা শ্রমিক নেতার কাজ? যাতে কোলিয়ারির জিএম, সিএমডি দুঃখ না পান। শ্রমিক মরছে মরুক। এটা চলতে পারে না।’
কোনো এলাকায় কোলিয়ারি, শিল্প গড়ে উঠলে সেই এলাকার উন্নয়নের জন্য কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি স্কিম থাকে। যাতে এলাকার মানুষের উন্নয়ন হয়। জিতেন্দ্র বলেন, ‘সেই টাকায় শুধুই অফিসারদের ক্লাব হাউসের উন্নতি হবে। পাড়ার মনসা মন্দিরটা হবে না। শ্রমিক নেতারা কেন তা দেখছেন না।’ প্রকৃত শ্রমিক নেতা হলে শ্রমিকরা তাঁকে পুজো করবেন। শ্রমিক নেতা চন্দ্রশেখর বন্দ্যোপাধ্যায় কতদিন মারা গিয়েছেন। আজও পাণ্ডবেশ্বরের মানুষ তাঁর নাম করেন। আর আমরা সেই কাজের সুযোগ পেয়েও করছি না। মিনমিন করা ট্রেন্ড ইউনিয়ন চাই না। আপনারা শ্রমিক স্বার্থে কাজ করুন। আমি আপনাদের পাশে আছি। কোলিয়ারি আমার আবেগ, শ্রমিকের রক্তে কোলিয়ারির উৎপাদন চাই না।’
জিতেন্দ্রর এইসব শ্রমিক নেতাদের অস্বস্তিতে ফেললেও শিল্পাঞ্চলের বহু মানুষ সমর্থন করেছেন। কোলিয়ারি হোক বা কারখানা—দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে ধারাবাহিকভাবে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের নিরাপত্তার ত্রুটি সামনে আসছে। অথচ প্রতি কোলিয়ারি ও শিল্প ক্ষেত্রে সেফটি কমিটি থাকে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সেই সেফটি কমিটির সদস্য হন শ্রমিক নেতারাও। তাঁরা নিয়মিত কর্মক্ষেত্রের শ্রমিক নিরাপত্তা খতিয়ে দেখে সেফটি কমিটির মিটিংয়ে অংশ নেন। সেখানে শ্রমিক নেতারা যে ত্রুটি দেখেছেন, তা মিটিংয়ের রেজুলেশন বুকে নথিভুক্ত করানোর কথা। সেই অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ না নিলে তাদের বিরুদ্ধে আইনত ব্যবস্থাও নেওয়া যায়। কোলিয়ারির ক্ষেত্রে সেফটি কমিটির তিনটি স্তর রয়েছে। প্রতি কোলিয়ারিতে একটি করে ইউনিট সেফটি কমিটি রয়েছে। তার উপর রয়েছে এরিয়া সেফটি কমিটি এবং শেষে ইসিএলের হেডকোয়াটারে রয়েছে একটি সেফটি কমিটি। এই কমিটির মিটিংয়েই পরিকাঠামো ত্রুটি তুলে ধরার কথা। অভিযোগ, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আপোস করে আখের গুছিয়ে নিচ্ছেন নেতারা। সাধারণ মানুষ ও শ্রমিকদের এমন অভিযোগকে এদিন মান্যতাই দিলেন বিজেপি বিধায়ক।
জিতেন্দ্রর অভিযোগকে কার্যত মেনে নিয়েছেন সিটুর রাজ্য কমিটির সদস্য গৌরাঙ্গ চট্টোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, ‘আসলে কোলিয়ারিতেই সেফটি কমিটির সদস্যকে কাজ করতে হয়। ফলে অনেক সময় কর্তৃপক্ষের চাপে তাঁরা মুখ খুলতে পারেন না। তবে, আমাদের সংগঠনের সদস্যরাই বেশি সরব থকেন। একটা সময়ে উনিই তো শ্রমিক আন্দোলন ভেঙে কর্তৃপক্ষকে খুশি করেছেন। এখন সাধু সাজছেন।’



