অগ্নিভ ভৌমিক, কৃষ্ণনগর: ভাগ্যিস, দেবাদিদেব মহাদেবের আশীর্বাদ নিতে গিয়েছিলেন কৃষ্ণনগরের নবদম্পতি সুদীপ্ত দাস ও দেবশ্রুতি দাস! তা না হলে হরিয়ানার হিমাংশী নরওয়াল এবং বিনয় নরওয়ালের ভাইরাল হওয়া সেই হাড়হিম করা ছবির পাশে হয়তো ঠাঁই পেত আরও একটি ছবি! হিমাংশী-বিনয়ের বিয়ে হয়েছিল মাত্র দিন সাতেক আগে। আর সুদীপ্ত-দেবশ্রুতি সাতপাকে বাঁধা পড়েছিলেন মার্চে।
বৈসরণ উপত্যকার একটি পাহাড়ের কোলে শিবমন্দির। অভিশপ্ত ঘটনাস্থল থেকে সামান্য দূরে। ঘোড়া করে পৌঁছতে হয় ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’-এ। সুদীপ্তরা সেখানে যাওয়ার প্ল্যান করেও সিদ্ধান্ত খানিক বদল করেন। ঠিক করেন, আগে মহাদেবের আশীর্বাদ নেওয়া যাক। তারপর...। ঘড়িতে তখন দুপুর আড়াইটে। শিবমন্দিরে চরণামৃত খেয়ে সবে বেরিয়েছেন সুদীপ্ত-দেবশ্রুতি। তখনই তাঁদের চারপাশে হঠাৎ হুড়োহুড়ি। চারিদিকে আর্তনাদ। বাঁচাও বাঁচাও চিৎকার। প্রাণপণে ছুটছেন সকলেই। আর বলছেন—‘পালান...পালান...। জঙ্গিরা হামলা চালিয়েছে। ঘোর কাটাতে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েও ছিলেন সেই ‘রেড’ জোনে। ‘আমাদের তখন যে কী অবস্থা, সেটা কেবল দেবাদিদেবই জানেন! আতঙ্কে হাত-পা শুকিয়ে আসছিল। মূহুর্তের মধ্যেই গোটা এলাকায় দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়ে যায় সেনার।’ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পরো ফোনে কথা বলতে গিয়ে আঁতকে উঠছিলেন নবদম্পতি।
গাড়ির চালক তাগাদা দিতেই সম্বিত ফেরে তাঁদের। কোনওরকমে গাড়ি করে বেরিয়ে আসেন। শ্রীনগরে ফিরে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন তাঁরা। হোটেলে উঠে জানতে পারেন কমকরে ২৬ জন পর্যটকের প্রাণ কেড়েছে জঙ্গিরা। ততক্ষণে জঙ্গি হামলার আঁচ পড়েছে শ্রীনগরে। গোটা এলাকা থমথমে। ঝপাঝপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে দোকানপাট। হোটেলে বসে নবদম্পতি শুধু ভাবছিলেন, পরিকল্পনা পরিবর্তন করে দেব দর্শন করতে না গেলে কী যে হতো! এ যেন নতুন জীবন ফিরে পাওয়া। বর্তমানে তাঁরা শ্রীনগরেই রয়েছেন। বুধবার সেখানে বন্ধ পালিত হয়। জোরদার করা হয়েছে নিরাপত্তাও। কিন্তু আতঙ্কের রেশ কিছুতেই কাটছে না নবদম্পতির।
কৃষ্ণনগর শহরের বউবাজার এলাকায় বাড়ি সুদীপ্ত ও দেবশ্রুতির। মধুচন্দ্রিমায় কাশ্মীর গিয়েছেন তাঁরা। গত ১৫ এপ্রিল গিয়েছিলেন। গত এক সপ্তাহ ধরে সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত ভূস্বর্গের অপরূপ সৌন্দর্য্যের সঙ্গে তোলা ছবি, রিলস আপলোড করছিলেন নবদম্পতি। সবকিছুই ছিল স্বাভাবিক। আজ, বৃহস্পতিবার তাঁদের ফেরার কথা। তার আগেই ভূস্বর্গ এমন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি। গুলমার্গ, সোনমার্গ, কাশ্মীর ভ্যালি, টিউলিপ গার্ডেন, সবকিছুই ঘোরা হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল শুধু কাশ্মীরের পেহেলগাঁও। সেইমত মঙ্গলবার তাঁরা সেখানে যান। মন্দিরে পুজো দিয়ে বেরোনোর সময়ই বৈসরণ উপত্যকায় জঙ্গীরা রক্তের স্রোত বইয়ে দেয়।
এদিন ফোনে সুদীপ্ত বলছিলেন, ‘ সে এক ভয়ঙ্কর দৃশ্য! শিবমন্দিরে থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ঠিক ওঠার আগেই জানতে পারি আমাদের পাশেই কিছু একটা হয়েছে। প্রথমে আমরা কিছুই বুঝতে পারিনি। পরে সেনা বাহিনীর দৌড়ঝাঁপ শুরু হতেই টের পাই ভয়াবহ কিছু ঘটে গিয়েছে। তড়িঘড়ি হোটেলে ফিরে আসি। সেখানে জানতে পারি জঙ্গিদের হামলায় বহু পর্যটকের প্রাণ গিয়েছে। সেখান থেকে শ্রীনগরে ফেরার সময় দেখি, চারিদিকে সেনা-জওয়ানের ছয়লাপ। চলছে খুব কড়া চেকিং। শ্রীনগরেও সবকিছু বন্ধ। আমরা সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। স্থানীয় মানুষজনেরও খুব মন খারাপ। মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভূস্বর্গ এভাবে বদলে যাবে, তা তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি। মঙ্গলবার রাতেই বহু মানুষ জঙ্গি হামলার প্রতিবাদে মিছিল করেন। তাঁরাই আমাদের আশ্বাস দেন, চিন্তা করবেন না, আমরা তো রয়েছি।’ হিমাংশী-বিনয় ভাইরাল ছবিটা নিশ্চয় দেখেছেন সুদীপ্ত-দেবশ্রুতি!