নিজস্ব প্রতিনিধি, কৃষ্ণনগর: ইতিহাসের সঙ্গে যেন একই সুতোয় বাঁধা কৃষ্ণনগর রাজবাড়ি। নদীয়া জেলার ইতিহাস বলতে যেমন কৃষ্ণচন্দ্রের বংশের কথা উঠে আসে, তেমনই দেশভাগের সময় নদীয়ার ভাগ্য বদলের প্রসঙ্গেও বারবার সামনে আসে এই রাজপরিবারের নাম। সময়ের সঙ্গে রাজবাড়ির গায়ে লেগেছে রাজনীতির রং। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় নদীয়ার ‘ভারতভুক্তি’র প্রসঙ্গে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির ভূমিকা এখনও আলোচনার দাবি রাখে।
১৯৪৭। দেশভাগের উত্তাল সময়। অবিভক্ত নদীয়া তখন ছিল বিশাল এক জেলা। মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা ছিল জেলার তিনটি মহকুমা। অন্যদিকে, কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহকুমাও ছিল অবিভক্ত নদীয়ারই অংশ। দেশভাগের প্রাথমিক মানচিত্রে নদীয়ার বড়ো অংশকেই পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সেই খবর বেতারে ছড়াতেই নদীয়া জুড়ে শুরু হয় প্রবল ক্ষোভ। মানুষের মধ্যে তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। সেই সময়েই কৃষ্ণনগর রাজপরিবারের তরফে তৎকালীন গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসচর্চায় দাবি করা হয়। রাজপরিবারের তৎকালীন কর্তা সৌরীশচন্দ্র রায়ের উদ্যোগের কথাও উঠে আসে। দাবি ছিল, কৃষ্ণনগর-সহ নদিয়ার যে অংশটি ভারতভুক্তির উপযুক্ত, তা যেন ভারতের সঙ্গেই রাখা হয়।
এরপর বদলে যায় মানচিত্র। অবিভক্ত নদীয়ার মেহেরপুর, কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গা চলে যায় পূর্ব পাকিস্তানে। কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহকুমাকে নিয়ে তৈরি হয় নতুন নদীয়া। যার প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল এই কৃষ্ণনগর। সেই কারণেই ১৮ আগস্ট নদীয়ার ইতিহাসে এক আলাদা তাৎপর্য বহন করে। স্বাধীনতার তিন দিন পর কার্যত ভারতীয় প্রশাসনের অধীনে আসে এই ভূখণ্ড। সেই স্মৃতিতেই আজও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ১৮ আগস্ট ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালনের রীতি রয়েছে।
নদীয়ার আদি বাসিন্দা সঞ্জিতদত্তের কথায়, “নদীয়া পূর্ব বাংলার বা পাকিস্তানের অংশ হয়ে যাওয়ার খবর কোনোভাবে প্রচারিত হলে মানুষের মধ্যে প্রবল অনিশ্চয়তা এবং ক্ষোভ তৈরি হয়। অন্যান্যদের সঙ্গে রাজবাড়ির তরফ থেকেও মাউন্টব্যাটেনের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছিল। এরপর ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট বিকেলে আকাশবাণীতে নদীয়ার কৃষ্ণনগর ও রানাঘাট মহকুমাকে ভারতভুক্তির ঘোষণা করা হয়। ১৮ আগস্ট সকালে সংবাদপত্রে প্রকাশিত সংশোধিত মানচিত্র দেখে স্থানীয় মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরে।
দেশভাগের পরে নদীয়ার রানাঘাট, ধুবুলিয়া-সহ একাধিক এলাকায় উদ্বাস্তুদের ঢল নামে। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা মানুষের নতুন ঠিকানা হয়ে ওঠে নদীয়ার বিভিন্ন এলাকা। একই সঙ্গে ভেঙে যায় বহু পুরানো সাংস্কৃতিক যোগাযোগ। যে বাউল, কীর্তন ও বৈষ্ণব সংস্কৃতি অখণ্ড নদীয়ার মাটিতে পাশাপাশি বিকশিত হয়েছিল, রাষ্ট্রের সীমারেখা তাকে দু’ভাগে ভাগ করে দেয়।
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় ফকির লালন শাহের আখড়া চলে যায় বাংলাদেশের অংশে। আর নদীয়ার নবদ্বীপে থেকে যায় শ্রীচৈতন্যের প্রেম ও ভক্তির ঐতিহ্য।