


ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন—“যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজান্যহম্।মম বর্ত্মানুবর্ত্তন্তে মনুষ্যা পার্থ সর্বশঃ।।”
কৃষ্ণ কে? তাঁর আসল পরিচিতিই বা কী? ‘কৃষ্ণ’ শব্দের একাধিক ব্যাখ্যা আছে। সংস্কৃত ‘কৃষ্’ ধাতু থেকে ‘কৃষ্ণ’ শব্দের উৎপত্তি। ‘কৃষ্’ ধাতুর একটি মানে হ’ল কর্ষণ করা (to plough), অপর মানে হ’ল আকর্ষণ করা (to attract)। যে সত্তা বিশ্বের সকল সত্তাকে নিজের দিকে টানছেন, আকর্ষণ করছেন, তিনিই কৃষ্ণ। তাহলে কৃষ্ণ মানে বিশ্বের চক্রনাভি। ‘কৃষ্ণ’ শব্দের দ্বিতীয় অর্থটা হ’ল ‘ভূ’-বাচক অর্থাৎ যে সত্তা জীবের অস্তিত্ববোধের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছেন তিনিই কৃষ্ণ। কৃষ্ণ আছেন, তাই আমি আছি, আর কৃষ্ণ না থাকলে আমিও থাকছি না অর্থাৎ কৃষ্ণের অস্তিত্বের ওপরই আমার অস্তিত্ব নির্ভর করছে।
তোমরা জান, প্রতিটি সত্তার জন্যে এক একটি বীজমন্ত্র আছে। অর্থাৎ প্রতিটি সত্তা বিশ্বে এক এক ধরণের স্পন্দন সৃষ্টি করে থাকে আর সেই বিশেষ ধরণের স্পন্দনটা হ’ল একটা বীজমন্ত্র। কৃষ্ণের বীজমন্ত্র হচ্ছে ‘ক৯ং’ (klrm) = ক+৯+অনুস্বার। কৃষ্ণের জন্যে ‘ক৯ং’ বীজমন্ত্র হবার হেতুটা কী? ‘ক’ হচ্ছে কার্যব্রহ্মের বীজমন্ত্র। পরমপুরুষ তাঁর দিব্য দেহ থেকে এই পরিদৃশ্যমান জগৎখানি সৃষ্টি করেন। তাই আমি বলে থাকি বিশ্বের প্রতিটি সত্তার অস্তিত্বই হ’ল দৈবী অস্তিত্ব। প্রতিটি ছেলে, প্রতিটি মেয়ে, প্রতিটি জীবিত সত্তাই পরম দৈবী সত্তার এক একটি অবতার। তাই কেউই ঘৃন্য নয়, উপেক্ষণীয় নয়। সবাই পরম পিতার সন্তান।
পরম পুরুষ যখন কোন কিছু সৃষ্টি করেন, সেই অবস্থার দ্রষ্টা হিসেবে তিনিই হলেন কারণব্রহ্ম কারণ তিনিই তো সৃষ্টির মূল কারণ। তিনিই কারণ সত্তা আর তাঁর সৃষ্টি এই বিশ্ব হ’ল কার্যব্রহ্ম কারণ তিনিই কার্যস্বরূপ। কারণ ব্রহ্মের বীজমন্ত্র হ’ল ‘ঁওং’ আর কার্যব্রহ্মের বীজমন্ত্র হ’ল ‘ক’। তাই সংস্কৃত বর্ণমালায় ‘ক’ হ’ল আদি ব্যঞ্জন। আর্য-ভারতীয় বর্ণমালায় ‘ক’-কে ব্যঞ্জনের তালিকায় প্রথমেই রাখা হয়েছে। তার কারণ ‘ক’ ধ্বনিটি হ’ল সৃষ্ট বিশ্ব অর্থাৎ কার্যব্রহ্মের বীজমন্ত্র।
সংস্কৃত ‘ক’ শব্দের একাধিক অর্থ। ‘ক’ মানে বর্ণমালার আদি ব্যঞ্জন। ‘ক’ শব্দের অপর মানে জল যার পত্তযায়বাচক অন্যান্য শব্দ হচ্ছে ‘নীরম্’ , ‘তোয়ম্’ ‘উদকম্’ , ‘পানীয়ম্’, ‘কম্বলম্’ ইত্যাদি। ‘ক’ মানে পেলুম জল। সেদিন বলেছিলুম, যে ভূখণ্ড জল দিয়ে ঘেরা বা ঢাকা, তার নাম ‘কচ্ছ’ (ক+ছদ্+ড=কচ্ছ)। ভারতের পশ্চিমাঞ্চলের একটি এলাকার নাম কচ্ছ। ‘ক’ শব্দের তৃতীয় মানে কার্যব্রহ্ম অর্থাৎ এই পরিদৃষ্যমান জগৎ।
‘কৃষ্ণ’ শব্দের বীজমন্ত্র হ’ল ‘ক৯ং’। প্রথম বর্ণ হ’ল ‘ক’ কারণ এই ‘ক’-ই এই ব্যক্ত জগতকে নিয়ন্ত্রণ করে, ভালবাসে। শ্রীশ্রীআনন্দমূর্ত্তির ‘কৃষ্ণতত্ত্ব ও গীতাসার’ থেকে