কলকাতার প্রথম দুর্গাপুজো
  • ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

পুলকরঞ্জন চক্রবর্তী: এ এক অন্য কলকাতার গল্প। সেই কলকাতা আজ থেকে চারশো বছর আগের। ভাগীরথী (হুগলি) নদীর পূর্ব পাড়ে  ‘কলিকাতা’, ‘সুতানুটি’ ও ‘গোবিন্দপুর’ নিয়ে জল, জঙ্গলে ঘেরা ‘কলকাতা’ তখনও হোগলা বন, লতাগুল্ম আর সুন্দরী ও গরান গাছে ঢাকা সুন্দরবনের একটি অংশ। বাঘ, মেছোবিড়াল, বুনো শুয়োর এবং নানা বিষাক্ত সাপের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র সেই কলকাতায় তখনও জোব চার্নকের পা পড়েনি। আদিম অরণ্যঘেরা সেই কলকাতার বুকেই হয়েছিল প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব।

Advertisement

ঐতিহাসিকদের মতে, আজকের কলকাতা ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে সবচেয়ে পুরানো এবং প্রথম দুর্গা পুজো শুরু হয়েছিল ১৬১০ খ্রিষ্টাব্দে বড়িশার সাবর্ণ রায় চৌধুরি বাড়িতে আর তার নেপথ্যে ছিল এক বিশাল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা।
সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুতে কলকাতার বেশিরভাগ অংশই যখন গভীর জঙ্গল ও জলাভূমিতে ডুবে ছিল, তখন সেই কলকাতার মধ্যে বড়িশা ছিল এক উন্নত ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা।
দশম শতাব্দীতে গৌড়ের রাজা আদিশূরের আমন্ত্রণে যে পাঁচজন বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ বাংলায় আসেন, তাঁদের অন্যতম ছিলেন মহর্ষি সৌভরি উপাধ্যায়ের পুত্র বেদগর্ভ, যাঁর গোত্র ছিল ‘সাবর্ণ’। এই বেদগর্ভকেই সাবর্ণ রায় চৌধুরি বংশের আদিপুরুষ বলে মনে করা হয়। এই বংশের ১৯তম পুরুষ পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি ‘পঞ্চু শক্তিখান’ নামেও পরিচিত ছিলেন, পঞ্চদশ শতাব্দীতে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের সেনাবাহিনীতে একজন দক্ষ অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে সম্রাট তাঁকে ‘খান’ উপাধি এবং ২৪ পরগনায় ৮৫টি গ্রামের জায়গিরদারি দিয়েছিলেন। পঞ্চানন গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রপৌত্র ছিলেন জীয়া গঙ্গোপাধ্যায়, পরবর্তীকালে যিনি সাধক কামদেব ব্রহ্মচারী নামে পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর পুত্র লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় ছিলেন এই বংশের সবচেয়ে যুগান্তকারী পুরুষ যার হাত ধরেই কলকাতার প্রথম দুর্গোৎসবের সূচনা হয়েছিল।
১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সেনাপতি মানসিংহ যখন বাংলার প্রতাপশালী বারো ভুঁইয়াদের দমন করতে আসেন, তখন এই লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে রণকৌশল ও ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে প্রভূত সাহায্য করেছিলেন। লক্ষ্মীকান্তের এই আনুগত্য ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গির তাঁকে ‘মজুমদার’ ও ‘রায় চৌধুরি’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। কালক্রমে এই উপাধি তাঁদের পারিবারিক পদবিতে রূপান্তরিত হয় এবং তাঁদের গোত্র ‘সাবর্ণ’-র সঙ্গে যুক্ত হয়ে তাদের স্থায়ী পারিবারিক নাম হয় ‘সাবর্ণ রায় চৌধুরি’।
একই সঙ্গে সুতানুটি, গোবিন্দপুর, কলিকাতা ছাড়াও নদীয়া ও চব্বিশ পরগনার এক বিশাল অঞ্চলের কর আদায়ের অধিকার বা জায়গিরদারি এই লক্ষ্মীকান্তের হাতেই ন্যস্ত করেছিলেন মানসিংহ। অধিকার পেয়ে প্রায় রাতারাতি তিনি হয়ে উঠেছিলেন দক্ষিণবঙ্গের অন্যতম প্রভাবশালী এক সামন্তপ্রভু বা শাসক।
১৬১০ সালের শরৎকালে লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারের স্ত্রী ভগবতী দেবী বড়িশার এই প্রধান কাছারি বাড়িতে একটি বড়ো উৎসব করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। স্ত্রীর অনুপ্রেরণাতেই লক্ষ্মীকান্ত বড়িশার সেই কাছারি বাড়ির প্রাঙ্গণে একটি ঐতিহ্যবাহী ‘আটচালা’ বা চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি করেছিলেন। সেই চণ্ডীমণ্ডপেই তিনি প্রথমবার মা দুর্গার ‘একচালা সপরিবার’ প্রতিমা গড়ে পুজোর সূচনা করেন। একচালার এই রূপটি ছিল আসলে তৎকালীন বাঙালি সনাতন একান্নবর্তী বা যৌথ পরিবারের এক স্বর্গীয় প্রতিফলন। মা দুর্গা এখানে কেবল সংহারকর্ত্রী রূপী ঈশ্বরী নন, তিনি যেন ঘরের মেয়ে, যিনি বছর শেষে তাঁর চার সন্তানকে নিয়ে বাপের বাড়ি এসেছেন।
কুমার পাড়ার শিল্পীরা পরম যত্নে সুতলি বা পাটের দড়ি দিয়ে খড় বেঁধে তৈরি করেছিলেন দেবীর অবয়ব। এই খড়ের কাঠামোর ওপর দেওয়া হয়েছিল তিন স্তরের মাটির প্রলেপ। প্রথম স্তরটি ‘একটেল’ বা মোটা আঠালো মাটি— যা খড়কে ধরে রাখে। দ্বিতীয় স্তরটি ‘দোমাটি’, যা গঙ্গার পলিমাটি, পাটকুচি এবং তুষের মিশ্রণে তৈরি হয়েছিল, যেটি প্রতিমার গায়ে কোনো ফাটল ধরতে দেয়নি। তৃতীয় স্তরে খড়িমাটি দিয়ে প্রতিমা সাদা করে শিউলি ফুলের বোঁটার রস, তেঁতুল বিচির আঠা, আলতা এবং ভুসো কালি দিয়ে তৈরি হয়েছিল দেবীর গায়ের রং ও অলংকরণ। দেবীর গায়ের রং করা হয়েছিল শিউলি ফুলের বোঁটার মতো সোনায় মোড়ানো হলুদ আভাযুক্ত। কংস নদীর বা গ্রামের বিল থেকে সংগৃহীত শোলা দিয়ে তৈরি হয়েছিল দেবীর মুকুট ও গহনা। মিথিলার প্রখ্যাত পণ্ডিত বিদ্যাপতি রচিত ‘দুর্গাভক্তিতরঙ্গিণী’ নামক এক প্রাচীন পুঁথি বা পাণ্ডুলিপি অনুসরণ করে নির্ধারিত হয়েছিল সেই দুর্গা পুজোর বিধি। সেই প্রথম পুজোয় মহিষ ও পাঁঠা বলির তান্ত্রিক মতে ‘মাসভক্ত বলি’—উড়দ ডাল, দই ও রক্ত দিয়ে তৈরি বিশেষ নৈবেদ্য দেওয়া হয়েছিল।
ইতিহাস অনুসারে, লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার মুঘলদের জায়গিরদার হলেও, তাঁর পুজো ছিল সর্বজনীন ও প্রজাবাৎসল্যের এক বড়ো উদাহরণ। দূর-দূরান্ত থেকে আসা হাজার হাজার দরিদ্র প্রজা এবং বহিরাগতের জন্য কাছারি বাড়ির প্রাঙ্গণেই বসত মহাপ্রসাদের আসর। লণ্ঠনের মৃদু আলোয় মাটির বাসনে পরিবেশন করা হত ঘি-ভাত, ভাজা, হরেক রকমের তরকারি, পায়েস ও চন্দ্রপুলি। 
১৬৯০ সালে জোব চার্নক সুতানুটিতে আসার পর, ১৬৯৮  সালে মুঘল বাদশাহের নির্দেশে সাবর্ণ রায় চৌধুরি পরিবার মাত্র ১ হাজার ৩০০ টাকার বার্ষিক খাজনার বিনিময়ে কলিকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর গ্রাম তিনটির জমিদারি স্বত্ব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এই ঘটনার পরে তাঁরা সপরিবারে কলকাতার কেন্দ্রস্থল ছেড়ে দক্ষিণ কলকাতার বড়িশা অঞ্চলে চলে আসেন এবং সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
জমিদারি হস্তান্তরের পর, বড়িশা কাছারি বাড়িটিই তাঁদের প্রধান পারিবারিক বাসভবনে রূপান্তরিত হয়ে ওঠে এবং ১৬১০ সালে শুরু হওয়া সেই পুজো আজ ৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে একই নিয়মে নিরবচ্ছিন্নভাবে বড়িশার মাটিতে উদ্‌যাপিত হয়ে আসছে। যদিও সাবর্ণ রায় চৌধুরি পরিবারের বংশধরেরা বর্তমানে মোট আটটি বাড়িতে এই দুর্গাপুজোটি পরিচালনা করেন। এর মধ্যে ছ’টি পুজো হয় বড়িশায় এবং বাকি দু’টি বাইরে। মায়ের বিশেষ ভোগ হিসেবে ল্যাটা বা শোল মাছ পুড়িয়ে, তাতে মাখন মাখিয়ে দেবীকে নিবেদন করার এক অনন্য প্রথা এই পুজোর অঙ্গ হয়ে আজও থেকে গেছে।