নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সুদূর ব্যাংকক থেকে আমদানি করা হচ্ছিল নানা ধরনের নিষিদ্ধ মাদক। যাদবপুর এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেগুলি মজুত করা হচ্ছিল। সেখান থেকে সেই মাদক ছড়িয়ে পড়ছিল শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, এমনকি ভিন রাজ্যেও। যাদবপুরে বসে গোটা কারবার নিয়ন্ত্রণ করছিল এই মাদক চক্রের ‘কিং পিন’ তৌসিফ আহমেদ। মহিলা ‘এজেন্ট’ নিয়োগ করা হয়েছিল বিদেশ থেকে নিষিদ্ধ মাদক আনার জন্য। এই চক্রের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য হাতে আসার পর গত শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিজয়গড়ের দু’টি বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় ডিরেক্টরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্স (ডিআরআই)। তাতেই বড়সড় আন্তর্জাতিক মাদক চক্রের পর্দা ফাঁস হয়ে গেল। সামনে এল একাধিক চাঞ্চল্যকর তথ্য। তৌসিফ আহমেদকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি সেখান থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয় বিপুল পরিমাণ কোকেন, গাঁজা ও হাইড্রোপনিক উইড (নেশাসক্তদের কাছে পরিচিত ‘আগাছা’ নামে)। গ্রেপ্তার করা হয় তৌসিফের ছয় সঙ্গীকে। পরে তৌসিফকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে কলকাতা বিমানবন্দর থেকে তিন মহিলা ‘এজেন্ট’-কে নিষিদ্ধ মাদক সহ গ্রেফতার করা হয়। ফলে এই কাণ্ডে মোট ধৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০। বাজেয়াপ্ত হওয়া মাদকের বাজারমূল্য আনুমানিক ২৬ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে।
মাস তিনেক আগে থেকে ডিআরআই তৌসিফের উপর নজরদারি শুরু করে। তদন্তকারীরা দেখেন, তৌসিফ মাঝেমধ্যেই ব্যাংকক, হংকং বা দুবাই আসা-যাওয়া করেছে। সপ্তাহে সপ্তাহে তৌসিফের নতুন মোবাইল হ্যান্ডসেট ও নম্বর সহ যাবতীয় খুঁটিনাটি তথ্য পৌঁছে যাচ্ছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সির কাছে। তার ফোনে আড়ি পেতে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, তৌসিফের সঙ্গে ব্যাংকক সহ বিভিন্ন দেশের মাদক কারবারিদের নিয়মিত কথা হচ্ছে। বিদেশ থেকে কোকেন, ‘আগাছা’ আনার জন্য রয়েছে মহিলাদের বিশেষ টিম। কলকাতায় মাদক কারবারের মাথা তৌসিফের অধীনে কয়েকশো এজেন্ট, ডিস্ট্রিবিউটর, সাব এজেন্ট রয়েছে। ফোনে অর্ডার যাচ্ছে তার কাছে। ক্যুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় মাদক পৌঁছে যাচ্ছে। এভাবে কোটি কোটি টাকা কামাচ্ছে তৌসিফ। এসব তথ্য হাতে নিয়েই শুক্রবার বিজয়গড়ের বাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। সেখান থেকে ৩৪১ গ্রাম কোকেন, ২১ কেজি ‘আগাছা’ ও ১০ কেজি সাধারণ গাঁজা বাজেয়াপ্ত করা হয়। তৌসিফের ছয় সঙ্গী ধরা পড়ে। তার মোবাইল ঘেঁটে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, তিন মহিলা ব্যাংকক থেকে নিষিদ্ধ মাদক নিয়ে এদিনই কলকাতা বিমানবন্দরে নামছে। সেই মতো অন্য একটি টিম বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতার করে তিন মহিলাকে। তাদের কাছ থেকেও বিভিন্ন নিষিদ্ধ মাদক মেলে।
সূত্রের খবর, তৌসিফ তদন্তকারীদের জানিয়েছে, বছর তিনেক ধরে সে এই কারবার চালাচ্ছে। ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মাদক কাবরারিদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। এরপর মেসেজে কথা হতো। প্রথমের দিকে সে নিজেই মাদক নিয়ে এসেছে। ‘ব্যবসা’ বাড়লে সে একাধিক মহিলাকে নিয়োগ করে বিদেশ থেকে মাদক আনার জন্য। ‘অ্যাসাইমেন্ট’ পিছু বিপুল টাকা কমিশন দিচ্ছিল তাদের। দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর দিয়ে ‘এজেন্ট’দের মাধ্যমেই কোকেন পাচার হচ্ছিল। ‘আগাছা’র ক্রেতা মূলত পড়ুয়ারা! তাদের ‘অর্ডার’ নেওয়ার জন্য হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ রয়েছে। টাকা মেটাতে হতো অনলাইনে।