সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: বর্ধমান-কালনা রোড। মোটামুটি ঝকঝকে রাস্তা। সাঁই সাঁই করে ছুটছে একের পর এক গাড়ি। যেতে যেতে পড়ে মেমারি থানার কুচুট পঞ্চায়েত এলাকা। কালেশ্বর গ্রামে যাত্রী প্রতীক্ষালয়। পাশেই বিস্তীর্ণ ধান জমি। জুন মাসের প্রথম দিক। চাষের কাজ তখনও শুরু হয়নি। আগাছা ভর্তি জমিতে কেউ কেউ গোরু চরাচ্ছেন। আচমকা কয়েকটা গোরু প্রতীক্ষালয়ের পিছনে ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়ে। তাদের পিছু নেয় এক গ্রামবাসী। কিছুটা এগোতেই তাঁর শিরদাঁড়া দিয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে আসতে শুরু করে। সবুজ ঘাসের উপর পড়ে দু’টি কাটা হাত। ইতিউতি চোখ ঘোরাতে ফের নজরে পড়ে দু’টি কাটা পাও। তার পাশেই দেহের নিম্নাংশ। আরও কিছুটা দূরে পেট থেকে গলা। তখনও রক্ত চুঁইয়ে পড়ছে প্রতিটি দেহাংশ থেকে। ভয়ার্ত গলায় জুড়ে দেন আর্তচিৎকার। প্রতীক্ষালয়ে যাঁরা ছিলেন তাঁরা প্রথম যান। গ্রামবাসীরাও ছুটে আসেন। কিছু পরেই আসে মেমারি থানার পুলিশ।
ঝোপের ভিতর চলল দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি। দেহের টুকরো টুকরো কাটা অংশকে এক জায়গায় করা হল। তাতে বোঝা গেল দেহটি কোনো এক যুবতীর। কিন্তু, তন্নতন্ন করে খুঁজেও মিলল না মুন্ডু। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা এলেন। নমুনা সংগ্রহ চলল। মাঠের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ঘোরাঘুরি করলেন তদন্তকারীরা। কাটা মুন্ডুর হদিশ নেই। এখানেই আপাতত শেষ প্রাথমিক তদন্ত। কিন্তু, কে এই যুবতী? কেনই বা তাঁর এমন পরিণতি? অপরাধ বিজ্ঞানের যুক্তি বলে, খুনের তদন্তে মুন্ডু না পেলে ধড়ের পরিচয় পাওয়া বেশ কঠিন। মাথার খুলির উপর তদন্তের অনেক কিছুই নির্ভর করে। থ্রি-ডি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিহতের চেহারার একটা আনুমানিক অবয়ব তৈরি করা সম্ভব হয়। যাতে শনাক্তকরণের কাজ সহজ হয়।
তবুও আদাজল খেয়ে যুবতীর পরিচয় জানতে ময়দানে নামেন তদন্তকারীরা। এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখা শুরু করলেন। ফুটেজে রাস্তা দিয়ে বহু গাড়িকে হুসহাস করে বেরিয়ে যেতে দেখা গেল। কিন্তু কোনো গাড়ি থেকে তো দেহাংশ ফেলার দৃশ্য দেখা গেল না! এক পুলিশ আধিকারিক সেই সময় বলেছিলেন, খুনিরা নির্মম ভাবে ওই যুবতীকে খুন করেছে। তারপর দেহ টুকরো টুকরো করে। পরে ব্যাগে ভরে এনে দেহাংশ ঝোপে ফেলে দেয়। খুনিরা বেশ পাকা মাথার। তারা বেশ করেই জানত, তদন্তের মোড় ঘোরাতে পারে একমাত্র মুন্ডু। সেই কারণে তারা কাটা মাথা অন্যত্র ফেলে দিয়েছে।
তদন্তে নেমে ঘটনার সঙ্গে বেনাচিতি স্যুটকেস কাণ্ডের খানিক মিল পেয়েছিলেন আধিকারিকরা। ২০১৮ সালের ১৫ মে। ঘাম ঝরানো দিনে বেনাচিতির একটি আবাসনের লিফটের পাশে পড়ে থাকা স্যুটকেস থেকে উদ্ধার হয় এক বধূর টুকরো টুকরো দোহংশ। ওই ঘটনার কয়েক মাস আগে ব্যাঙ্ক ম্যানেজার দুর্গাপুরের এক গৃহবধূ ও তাঁর সন্তানকে টুকরো টুকরো করে কেটে ট্রলি ব্যাগে ভরে গঙ্গায় ফেলতে গিয়ে ধরা পড়েছিল। ওই বধূকে প্রথমে শ্বাসরোধ করে খুন করা হয়। পরে দেহটি বাথরুমে নিয়ে গিয়ে ধারাল অস্ত্র দিয়ে টুকরো টুকরো করা হয়। বেনাচিতির ওই বধূকেও একই কায়দায় খুন করা হয়। বেনাচিতির ওই দুই বধূ খুনে পরকীয়া তত্ত্ব উঠে আসে। খুনিরা ধরাও পড়ে যায়। কারণ, দু’টি খুনের ক্ষেত্রে পরিচয় জানতে খুব একটা কাঠখড় পোড়াতে হয়নি তদন্তকারীদের।
কিন্তু, মেমারিতে ওই ঝোপের মধ্যে কোন যুবতীর নির্মম পরিণত হয়েছিল, সেটা পাঁচ মাস পরও জানতে পারেনি পুলিশ। এক তদন্তকারীর কথায়, কাটা মুন্ডুটি খোঁজার অনেক চেষ্টা করা হয়েছিল। রাজ্যের প্রতিটি থানার পুলিশকেও তথ্য শেয়ার করা হয়েছিল। কিন্তু লাভ হয়নি।
অতঃপর, মুন্ডুহীন ধড়ের পরিচয় আজও অজ্ঞাত! অধরা খুনিরাও।



