প্রদীপ্ত দত্ত, ঝাড়গ্ৰাম: খরস্রোতা পাহাড়ি ডুলুং নদী। চারিদিকে গা ছমছম করা ঘন জঙ্গল। মাঝখানে অধিষ্ঠিত দেবী কনক দুর্গার মন্দির। ঠায় দাঁড়িয়ে প্রায় চারশো বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য। তাকে ঘিরে কতই না কিংবদন্তী! কথিত, অষ্টমীর রাতে কনক মা কারও হাতে সেবা নেন না। মন্দিরের রান্নাঘরে নিজেই ভোগ রাঁধেন। কিংবদন্তী কাহিনিতে যে ভোগকে বলা হয়েছে ‘বিরাম ভোগ’।
ঝাড়গ্রামের চিল্কিগড়ে তখন সামন্ত রাজা গোপীনাথ সিংহের রাজত্ব। একদিন রাতে দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পান—কাঁকন দিয়ে বিগ্রহ বানিয়ে পুজো করতে হবে। সেই মতো রানির হাতের সোনার কাঁকন দিয়ে মূর্তি নির্মাণ করে জঙ্গল ঘেরা ওই জায়গায় প্রতিষ্ঠা করেন গোপীনাথ। সেই কারণেই চিল্কগড়ের উমা কনক দুর্গা নামে খ্যাত। মন্দির চাতালেই দেবী দুর্গার রান্নাঘর। অষ্টমী দিন গভীর রাতে সেখানে আসেন স্বয়ং দেবী। বিরাম ভোগ রান্না করেন নিজের হাতেই। এমনই বিশ্বাস ভক্তকুলের। আর ক’দিন পরই পুজো। মন্দিরে সেই ভোগ রান্নার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।
কথিত, অষ্টমীর রাতে সুচিবস্ত্র পরিহিত পুরোহিত বলির মাংস নিয়ে রান্নাঘরে যাবেন। প্রথা মেনে একটি নতুন মাটির হাঁড়িতে রাখবেন মাংস। তাতে মেশানো হবে নানাবিধ মশলা। তারপর উনুনে জ্বালিয়ে দেওয়া হয় তিনটি কাষ্ঠখণ্ড। হাঁড়ির মুখ মুড়ে দেওয়া হয় জঙ্গলের শালপাতা দিয়ে। দেবীর রান্নার জন্য রাখা হয় খুন্তি। পুরোহিত মন্ত্রপাঠের মাধ্যমে রান্নাঘরের দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে আসেন। জঙ্গল পথ উজিয়ে তিনি চলে চিল্কিগড় রাজবাড়ির বর্তমান কোনও বংশধরের কাছে। রান্নাঘারের চাবি তুলে দেন তাঁর হাতে।
নবমীর সকাল। চাবি নিয়ে এসে খোলা হয় রান্নাঘরের দরজা। দেবীর সেই রন্ধনকৃত ভোগ উৎসর্গ করেন পুরোহিত। চিল্কিগড় রাজবাড়ির বর্তমান উত্তরসূরি তেজসচন্দ্র দেও ধবলদেব বুধবার বলছিলেন, ‘চিল্কিগড় রাজবাড়ির সঙ্গে কনক দুর্গা মন্দিরের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত। দেবী এখানে জাগ্ৰত। যুগ যুগ ধরে ভক্তরা বিশ্বাস করেন, অষ্টমীর রাতে দেবী মন্দিরে আসেন। রান্নাঘরে নিজের হাতে ভোগ রান্না করেন।’
রাজ-প্রথা মেনে পুজোর সূচনা ষষ্ঠীতে। ওইদিন রাজবাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যরা সকালে শোভাযাত্রা সহকারে প্রাচীন খড়্গ ও পূর্ণঘট নিয়ে মন্দিরে যান। খড়্গটিকে রাজদণ্ডের প্রতীক হিসেবে মানা হয়। মন্দিরের পুরোহিত গৌতম ষড়ঙ্গি বলছিলেন, ‘পুজোয় দেবীকে নানা আমিষ ভোগ উৎসর্গ করা হয়। ভোগে হাঁসের ডিম ও নদীর মাছ থাকে। দশমীতে পান্তাভাত, শাক ভাজা ও মাছ পোড়া। বলি দেওয়ার প্রথা লোকচক্ষুর আড়ালেই সম্পন্ন হয়।’ ঝাড়গ্রাম শহরের বাসিন্দা শিক্ষক মৃন্ময় হোতার কথায়, ‘কনক দুর্গাকে ঘিরে নানা লোকশ্রুতি ছড়িয়ে রয়েছে। পুজোর প্রথা ও আচারে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি মিলেমিশে রয়েছে।’-নিজস্ব চিত্র