নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: পাঁচের দশকের শুরুতে আজকের ঢাকুরিয়ায় তখন পুকুর, মাঠ ও ইতস্তত জঙ্গল। আচমকা সেখানে বসন্তের প্রকোপ। সদ্য পূর্ববঙ্গ থেকে ওই জলা জায়গায় পাড়ি জমানো পরিবারগুলি রোগের প্রকোপে দিশাহারা। রোগমুক্তির জন্য বাসিন্দারা একটি বটগাছের তলায় শীতলার থান তৈরি করে পুজো শুরু করলেন। তারপর ধীরে বসন্তের প্রকোপ কমল। কিন্তু রোগ বিদায় নিলেও শিয়রে নতুন বিপদ এসে উপস্থিত। ওপার বাংলা থেকে সব হারানো পরিবারগুলি স্থানীয় গুন্ডাদের হামলার মুখে পড়লেন। অনবরত জায়গা খালি করার হুমকি আসতে থাকল। হাতে লাঠি নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে গরিব মানুষগুলি এরপর জোট বাধল।
জ্ঞানেন্দ্র, ললিতমোহন ও আশুতোষ নামের তিন যুবককে প্রবীণরা কালীপুজো শুরুর পরামর্শ দিলেন। ১৯৫৫ সালে দীপান্বিতা অমাবস্যায় স্থানীয়রা কালীপুজো করলেন। এরপর অলৌকিক ঘটনা। ভয়ঙ্কর ঝড়বৃষ্টিতে প্রতিমা বিসর্জনই দেওয়া গেল না। জনশ্রুতি, বিপদের সময় কালী নিজে যুবকদের স্বপ্নে এসে বললেন, ‘আমাকে বিসর্জন দিতে হবে না। মন্দির গড়ে এখানেই নিত্যপুজোর ব্যবস্থা কর।’ এরপর খড় ও টিনের চালা দিয়ে তৈরি ছোট একটি মন্দির তৈরি হল। শীতলার সেই থানে এলেন কালী। তা হয়ে উঠল দুর্গত মানুষের ভরসাস্থল। সবাই বিশ্বাস করতে শুরু করলেন, কালী যেন এক অদৃশ্য লক্ষ্মণরেখা টেনে সব বিপদকে ত্রিসীমানায় ঘেঁষতে দিচ্ছেন না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক সন্ত্রাসে নাম জড়িয়ে যাওয়া ডাকাবুকো এক কংগ্রেসি নেতার জীবনও এক লহমায় আমূল বদলে গিয়েছিল ঢাকুরিয়ার শীতলাতলার কালীর আশীর্বাদে।
১৯৫৭ সালের ১৫ জানুয়ারি, বাংলা ১৩৬৩ সনের ১ মাঘ গর্ভমন্দিরে দেবী দক্ষিণাকালীর পাথরের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই বিগ্রহই আজও পূজিত। ঢাকুরিয়া ব্রিজের ঠিক পূব দিকের গলির মুখেই রয়েছে কালীবাড়ি। সেখানে ঢুকলে রাধাগোবিন্দ, রাম, সীতা, মনসা, অন্নপূর্ণা, হনুমান থেকে শুরু করে বাবা লোকনাথেরও মূর্তির অবস্থান। মন্দির কমিটির সম্পাদক সোমশংকর চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সাতের দশকে কংগ্রেস কর্মী হিসাবে নানা রাজনৈতিক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়েছিলাম। চারিদিকে শত্রু। মন্দিরে মায়ের কাছে শত্রুমুক্তির প্রার্থনা জানাতাম। ধীরে ধীরে দেখলাম মায়ের কৃপায় সব বিপদ কেটে গেল। আজ রাজনীতি ছেড়ে মন্দির পরিচালনার কাজেই জুড়ে গিয়েছি।’
এ মন্দিরে নির্দিষ্ট আসনবেদিতে শায়িত মহাদেবের বুকে দণ্ডায়মান মাঝারি উচ্চতার কষ্টিপাথরের দেবীবিগ্রহ। মাথায় রুপোর মুকুট। সোমশংকরবাবু বলেন, ‘মন্দিরের সারা দেওয়ালে রয়েছে দশমহাবিদ্যার রূপ। প্রতি সোমবার ভোগে ঘি-ভাত, মঙ্গল, বুধ, শুক্র, শনি ও রবিবার খিচুড়ি ভোগ দেওয়া হয়। বৃহস্পতিবারের থাকে সাদা অন্ন, পাঁচ রকমের ভাজা, তরকারি ও পায়েস।’



