


দেবাঞ্জন দাস, নাগরাকাটা: ওড়িশার ঢেঙ্কানল থেকে উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স, দূরত্বটা ১১০০ কিলোমিটারের! সেই দূরত্বটা পার করে ক্ষোভটা এখন পুঞ্জীভূত নাগরাকাটা, মালবাজার, মাদারিহাট, কুমারগ্রামের মতো আরও বেশ কিছু জনপদে! গেরুয়াশাসিত ওড়িশা এখন ডুয়ার্সের বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম ইস্যু! মঙ্গলবার বিকেলে মাটিয়ালি ব্লকের বাতাবাড়ি জ্যোতি আশ্রম ক্যাথলিক চার্চে আরও একবার যেন আছড়ে পড়ল জমে থাকা ক্ষোভের ঢেউ! চার্চের মঞ্চে তখন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। চার্চের ভিতরে সারি সারি পাতা চেয়ারে গোটা ডুয়ার্সের খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। কে নেই সেই ভিড়ে! বিশপ ফেবিয়ন টোপ্পো, ফাদার উদয়চন্দ্র এক্কা, ফাস্টার্স-সিস্টার্স, চা-বাগানের শ্রমিক আর সাধারণ মানুষ। সমস্বরে শপথ নিল গোটা জমায়েত—জিততে হলে, জেতাতে হবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে! বাঁচতে চাই, সবাই তৃণমূল তাই! মমতার নিদান—একতাই শক্তি! বিভাজনে ধ্বংস হবে গোটা সমাজ! হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান—এ দেশটা সবার!
বাংলার ভোটে ওড়িশা কীভাবে? ব্যাখ্যা দিলেন ফাদার এক্কা। বললেন, ওড়িশায় বিজেপি সরকার আসার পর থেকে খ্রিস্টানদের উপর নিপীড়ন-নির্যাতন বেড়েই চলেছে। জলেশ্বর, বালেশ্বর, মালকানগিরি আর গত জানুয়ারি মাসে ঢেঙ্কানলের ঘটনা। একজন ফাস্টার্সকে মারধর করে ‘জয় শ্রীরাম’ বলে গোবর খাওয়ানো হয়েছে। আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পায়নি চার্চ! তার আগে গত বড়োদিনে হামলা করে যাজককে মারধরের পাশাপাশি খ্রিস্টমাস্ট ট্রি আর সান্তাক্লজের প্রতিকৃতিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সব ঘটনার পিছনে কোথাও সরাসরি বিজেপি, আবার কোথাও বজরং দল রয়েছে। প্রশাসন নির্বিকার! ফাদার এক্কার কথায়—বহুত্ববাদের এরাজ্যে সেই একই কাণ্ড যাতে না ঘটে, সে কারণেই বিজেপিকে রোখার শপথ নেওয়া হয়েছে। অসাম্প্রদায়িক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আমরা থাকব।একধাপ এগিয়ে বিশপ টোপ্পো বললেন—মাদার টেরিজা সব আর্তের মা ছিলেন। তিনি চলে গিয়েছেন, আমাদের মতো আর্তদের দেখার জন্য মমতাকে রেখে গিয়েছেন।
মঞ্চে বসে মন দিয়ে সবার কথা শুনছিলেন মমতা। এরপর বক্তৃতাপর্বে তৃণমূল সুপ্রিমো প্রথমেই শুনিয়েছেন দেশের চিরাচরিত ঐতিহ্য—বহুত্ববাদের কথা। সেই ধারা বজায় রাখতে না পারলে সবকিছু যে টুকরো হয়ে যাবে, সে সতর্কবার্তাও শুনিয়েছেন মমতা। রক্ত ভাগ করার চেষ্টা যে চলছে, সে আক্ষেপ ছিল তৃণমূল সুপ্রিমোর কণ্ঠে! তাঁর আরজি, ‘জিয়ো অউর জিনে দো।’ পরামর্শ—একত্রিত হয়ে থাকলে, কেউ ভয় দেখাতে পারবে না। নাগরাকাটা, মাল, কালচিনি, মাদারিহাটের মতো ডুয়ার্সের বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে কোথাও ২০, কোথাও ১৮ আবার কোথাও ১০ শতাংশ ভোটার খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের! গত বিধানসভা নির্বাচনে সিংহভাগ ভোট পড়েছিল বিজেপির ঝুলিতে। তাহলে এবার বিরূপ কেন? জবাব দিলেন কুমারগ্রামের নির্মল এক্কা—ওদের (বিজেপি) বিশ্বাস করেছিলাম। সাথ দিয়েছিলাম। কিন্তু ওদের শাসিত রাজ্যে খ্রিস্টান ভাই-বোনদের উপর অত্যাচার শুরু হয়েছে, চলছেও। অনেক হয়েছে, আর নয়! এগিয়ে এলেন এক যুবক, নিজের পরিচয় দিলেন—মাটিয়ালি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। বললেন, আমাদের রাজ্যের ভিতই তো সবাইকে নিয়ে চলা। আমার নাম হোসেন হাবিবুল হাসান (বাবু)। চার্চের অনুষ্ঠানে এলাম, ফাদারের আশীর্বাদ নিলাম। এটাই তো বহুত্ববাদ!