


নয়াদিল্লি: ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর। হাতরাসে তরুণীকে গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় সারা দেশ তখন উত্তাল। কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান হাতরাসে যাচ্ছিলেন খবর সংগ্রহ করতে। কিন্তু মাঝপথেই বাধা। কাপ্পানকে গ্রেপ্তার করে উত্তরপ্রদেশ পুলিস। অভিযোগ আনা হল, তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। জেলে ঠাঁই হল ওই সাংবাদিকের। শুধু কাপ্পান নন। আসিফ সুলতান, ফাহাদ শাহ, সাজ্জাদ গুল, রূপেশকুমার সিং, পাওজেল চাওবা, প্রবীর পুরকায়স্থ, গৌতম নাভালখা...। তালিকাটা আরও লম্বা। কিন্তু এতজন মানুষের মধ্যে মিল একটাই। এঁরা প্রত্যেকেই সাংবাদিক, আর প্রত্যেকেই ভারতের রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অভিযুক্ত। কেন? এঁরা কেন্দ্র বা রাজ্যের বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে সময়ে মুখ খুলেছিলেন। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে এভাবে গণহারে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে মামলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল খোদ সুপ্রিম কোর্ট। অপারেশন সিন্দুর নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করায় একটি সর্বভারতীয় নিউজ পোর্টাল ও তার সম্পাদকের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ১৫২ নম্বর ধারায় মামলা দায়ের করেছিল অসম পুলিস। দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষার মতো বিষয়গুলি ওই ধারায় রয়েছে।
সেই মামলার শুনানি চলাকালীন বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করেছে, ‘সাংবাদিকতাকে রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে বিচার করা যায় না। কোনও সাংবাদিক সমালোচনামূলক প্রতিবেদন বা ভিডিও প্রকাশ করলেই তা দেশের ঐক্য, সার্বভৌমত্ব বা অখণ্ডতায় আঘাত করে না।’ বিচারপতি সূর্য কান্ত বলেন, ‘একটা প্রতিবেদন কি রাষ্ট্রের ঐক্য ও সার্বভৌমত্বের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে? এমন তো নয় যে কেউ দেশে অস্ত্র পাচার করছে।’ এর পরেই ওই নিউজ পোর্টাল ও তার সম্পাদককে রক্ষাকবচ দেওয়ার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, আপাতত কোনও পদক্ষেপ নিতে পারবে না অসম পুলিস। কেন্দ্রকেও এ নিয়ে নোটিস পাঠিয়েছে শীর্ষ আদালত।
তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ভারতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২১টি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের হয়েছে। আর ২০২৩ সালের ‘প্রিজন সেন্সাস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, জেলবন্দি সাত সাংবাদিকের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধেই রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চলছিল। কেউ হাতরাস গণধর্ষণ কাণ্ড নিয়ে, কেউ নতুন কৃষি আইন নিয়ে, আবার কেউ কোভিড মহামারীর সময় অব্যবস্থা বা কেন্দ্রীয় সরকারের অন্য কোনও নীতি নিয়ে খবর করেছিলেন। শুধুমাত্র স্তুতি না করে, সমালোচনা করাই ছিল এই সাংবাদিকদের একমাত্র ‘দোষ’। তাই তাঁদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ বানিয়ে দিনের পর দিন বিনা বিচারে জেলবন্দি করে রাখতে দু’বার ভাবেনি কেন্দ্র বা বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি।
গত জুন মাসে ইন্দোনেশিয়ার ভারতীয় দূতাবাসের ডিফেন্স অ্যাটাশে ক্যাপ্টেন শিব কুমার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছিলেন, অপারেশন সিন্দুরের সময় রাজনৈতিক নেতারা (কেন্দ্র) পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। আর তার জন্যই ভারতীয় বায়ুসেনাকে যুদ্ধবিমান খোয়াতে হয়েছে। সেনার ওই আধিকারিকের বক্তব্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট পোর্টালটি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১১ জুলাই অসমের এক বিজেপি নেতা মরিগাঁও থানায় পোর্টালটির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। বিষয়টি নিয়ে পাল্টা শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হয় ওই সংবাদমাধ্যম। তাদের তরফে দাবি করা হয়, বিএনএসের ওই ধারা অস্পষ্ট ও এটা বাক-স্বাধীনতার উপর সরাসরি হস্তক্ষেপ। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশকে স্বাগত জানিয়েছে ইন্ডিয়ান জার্নালিস্টস ইউনিয়ন (আইজেইউ)। তারা জানিয়েছে, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটা গণতন্ত্রের জয়।