সংবাদদাতা, তেহট্ট: একসময় ঝুলন পূর্ণিমা এলেই পাড়ায় পাড়ায় তৈরি হতো নকল ছোট ছোট পাহাড়। তার মধ্যে সাজানো থাকত বিভিন্ন পুতুল, রাধাকৃষ্ণকে বসানো হতো সুসজ্জিত দোলনায়। সন্ধ্যা নামলেই দল বেঁধে ছোটাছুটি করত ছেলেমেয়েরা। কোথাও আবার তৈরি হতো মানব ঝুলন। সেই ঝুলন দেখতে সন্ধ্যা থেকেই মানুষের ভিড় জমত পাড়ার পথে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়েছে উৎসবের সেই ছবি। আধুনিকতার চাপে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ঝুলনযাত্রা।
কয়েক বছর আগেও তেহট্টের বিভিন্ন গ্রাম ও পাড়ায় ঝুলনযাত্রাকে ঘিরে ছিল আলাদা উন্মাদনা। কার পাড়ার ঝুলন কত সুন্দর হবে, তা নিয়ে চলত একরকম নীরব প্রতিযোগিতা। মাটির মূর্তি, পুতুল, কাগজ ও নানা সামগ্রী দিয়ে তৈরি হতো ঝুলনের সাজ। রাধাকৃষ্ণের লীলার পাশাপাশি থাকত নানা পৌরাণিক কাহিনি ও সামাজিক ভাবনার উপস্থাপনা। কোথাও ফুটে উঠত রাজা হরিশচন্দ্রের কাহিনি, কোথাও আবার মহিরাবন বধ। সেই দৃশ্য দেখতে শুধু এলাকার মানুষ নন, আশপাশের গ্রাম থেকেও অনেকে ভিড় করতেন।
এলাকার প্রবীণ নাগরিক কৃষ্ণা ভট্টাচার্য ও আনন্দ রজক বলেন, ছোটবেলায় আমরা দল বেঁধে বিভিন্ন পাড়ায় ঝুলন দেখতে যেতাম। তখন পাড়ায় পাড়ায় কে কত সুন্দর ঝুলন করেছে, তা নিয়ে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলত। বিশেষ করে মানব ঝুলন দেখতে মানুষের লাইন পড়ে যেত। রাধাকৃষ্ণের লীলার পাশাপাশি নানা পৌরাণিক কাহিনি তুলে ধরা হতো। এখন সেই দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। প্রবীণদের কথায়, বদলে গিয়েছে বিনোদনের ধরন। হাতে হাতে মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের দাপটে পাড়ার সেই সামূহিক উৎসবের জায়গা অনেকটাই ফাঁকা। একসময় যে উৎসবকে ঘিরে সন্ধ্যার পর পাড়ার রাস্তায় মানুষের ঢল নামত, এখন সেখানে অনেকটাই নীরবতা। আর সেই হারিয়ে যাওয়া উন্মাদনাই আক্ষেপ বাড়াচ্ছে প্রবীণদের।
তাঁদের কথায়, ঝুলনযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব ছিল না, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল গ্রামবাংলার লোকসংস্কৃতি, শিল্পচর্চা ও পারস্পরিক সম্প্রীতির এক নিবিড় সম্পর্ক। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে ফের পাড়ায় পাড়ায় ঝুলন উৎসবের আয়োজন করা দরকার। নইলে একসময়ের প্রাণের উৎসবটি ধীরে ধীরে শুধু স্মৃতির পাতাতেই ঠাঁই নেবে।