নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: তোলাবাজি-কাটমানি ইস্যুতে বঙ্গ বিজেপির বিধায়ক-মন্ত্রীদের ভূমিকায় চটে লাল স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবার ক্ষমতায় আসা সরকারের মাত্র ১০০ দিন। তারই মধ্যে বিভিন্ন সূত্র মারফত শাহের মন্ত্রকে বঙ্গীয় পদ্ম জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে ভূরি ভূরি তোলাবাজি-কাটমানির অভিযোগ জমা পড়েছে। সম্প্রতি দিল্লিতে সুনীল বনসল, শমীক ভট্টাচার্য, শুভেন্দু অধিকারীদের ডেকে এই সমস্যা সমাধানে চরম বার্তা দিয়েছেন শাহ। সেই সূত্রেই তোলাবাজি-কাটমানিতে অভিযুক্ত মন্ত্রী-এমএলএ’দের প্রয়োজনে দল থেকে বহিষ্কারের হুঁশিয়ারি দিলেন শমীক। গেরুয়া শিবিরের জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে আয়োজিত এক কর্মশালায় রাজ্য বিজেপি সভাপতি বলেন, ‘অমিত শাহের অনুমতি নিয়েই আমি একটা বিষয় স্পষ্ট করতে চাই। দলের নাম ব্যবহার করে অন্যায় কাজ করলে প্রয়োজনে বিধায়কদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে। আমাদের ২০৭ জন বিধায়ক। মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, তার মধ্যে ২০ জন দলীয় বিধায়ককে দল থেকে বের করে দিলেও বিশেষ কিছু যায় আসে না। প্রচুর ত্যাগের পর আমরা ক্ষমতায় এসেছি। ক্ষমতার অপব্যবহার করতে দেব না। তাই দলের স্বার্থ এবং ভাবমূর্তি রক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হব না।’
জনতার দরবার থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিদিনই রাজ্য বিজেপি দপ্তরে পার্টির বিধায়কদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ জমা পড়ছে। গত তিন মাসে সেই বহর বাড়ছে। সুরাহা না হওয়ায় হতাশ বহু সাধারণ মানুষ। পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে তাঁদের একটা অংশ বিজেপি বিধায়কদের তোলাবাজি-সিন্ডিকেটরাজ-কাটমানি সংক্রান্ত অভিযোগ দিল্লির নেতাদের পাঠাচ্ছেন। অমিত শাহের অফিসে সেই অভিযোগপত্র জমা পড়েছে। তা দেখে কার্যত চক্ষু চড়কগাছ শাহের সহযোগীদের। বিষয়টি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নজরে আনা হলে তিনি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রয়োজনে পার্টি থেকে বের করে ‘তোলাবাজ’ বিজেপি বিধায়কদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হতে পারে।
বিধায়কদের উদ্দেশে শমীকবাবুর সাফ বার্তা, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিজেপির জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসছে। উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গ, দমদম হোক বা নিউটাউন—বিধায়কদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দলের কাছে পৌঁছেছে। রাজ্য সভাপতির সতর্কবাণী, ‘দলের কিছু বিধায়ক হয়তো মনে করছেন তাঁরা ব্যক্তিগত ক্ষমতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। তাঁদের জয়ের পিছনে দলের সংগঠন, কর্মীদের পরিশ্রম ও বহু মানুষের ত্যাগ রয়েছে। তাই বিধায়কদের নিজেদের দায়িত্ব ও দলের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা মনে রাখতে হবে।’ সেইসব ভুলে পদ্ম প্রতীকে জয়ী এমএলএদের একাংশ তোলাবাজি-সিন্ডিকেট চালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও আক্ষেপ করেন শমীকবাবু। তিনি বলেন, ‘টাকা তুলতে বিধায়করা এতটাই মরিয়া যে, কেউ কেউ ফিতে নিয়ে ফ্ল্যাট মাপতে পর্যন্ত ছুটছেন।’ দলীয় সতীর্থদের এই আচরণে চরম বিরক্ত শমীক ভট্টাচার্য। অবিলম্বে আইনসভার সংশ্লিষ্ট সদস্যদের শুধরে যাওয়ার পরমার্শ দিয়েছেন তিনি। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘শুধুমাত্র বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন বলেই কেউ নিজের ইচ্ছামতো কাজ করতে পারবেন না।’ দল সবার উপর নজরদারি চালাচ্ছে বলেও আকার ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছেন শমীকবাবু।
সূত্রের দাবি, তৃণমূল জমানার দুর্নীতির এই ‘রোগ’ দ্রুত বিজেপি আমলে ছড়িয়ে পড়েছে। তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী-বিধায়ক-কাউন্সিলার-নেতাদের চমকে-ধমকে ভিন্ন কায়দায় তোলাবাজি চালাচ্ছেন গেরুয়া জনপ্রতিনিধিরা। এক্ষেত্রে আম জনতার থেকে সরাসরি তোলাবাজি না করে তৃণমূলের ‘পরীক্ষিত তোলাবাজ’দের লুটেপুটে খাচ্ছে বিধায়কদের একাংশ।