মণিরাজ ঘোষ, খড়্গপুর: রেল শহর খড়্গপুরের রাজনীতিতে তাঁর আবির্ভাব খানিকটা ধূমকেতুর মতোই। ছাত্র-যুব রাজনীতি থেকে প্রথমবার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই একেবারে খড়্গপুর পুরসভার চেয়ারম্যান। তিনি খড়্গপুরের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক তথা সদ্যসমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের পরাজিত প্রার্থী প্রদীপ সরকার। বুধবারই তৃণমূলের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন প্রদীপ। কঠিন সময়ে দল তাঁকে জেলা সাধারণ সম্পাদকের পদ দিলেও, প্রদীপ অব্যাহতি নিয়েছেন। অভিযোগ তুলেছেন, দলের ভালো সময়ে তাঁকে বারবার অপমান করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ও পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন খড়্গপুর শহরের ৬ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলার প্রদীপ। ভবিষ্যতে রাজনীতির ময়দানেই থাকবেন বলেও জানিয়েছেন। রেল শহরের রাজনীতি সচেতন নাগরিকরা বলছেন, খড়্গপুরের রাজনীতিতে বারবার জ্বলেছে নিভেছে ‘প্রদীপ’। তবে, রাজনীতি থেকে হারিয়ে যায়নি কখনও। তবে কি এবার বিজেপিতেই জ্বলবে তৃণমূলের প্রদীপ? নাকি নিভে যাবে চিরতরে? সেই জল্পনা ঘিরেই এখন তোলপাড় মিনি ইন্ডিয়া খড়্গপুর।
শহরবাসী মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রাক্তন আইপিএস ও বর্তমান বিজেপি নেত্রী ভারতী ঘোষের হাত ধরে রাজনৈতিক উত্থান প্রদীপ সরকার ওরফে খোকনের। ২০১৫ সালে হেভিওয়েট জহর পাল, দেবাশিস চৌধুরী (মুনমুন), তুষার চৌধুরীদের পরিবর্তে আনকোরা প্রদীপকেই পুরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে বেছে নিয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। বিরোধীরা বলেন, এর নেপথ্য কারিগর ছিলেন পশ্চিম মেদিনীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার ভারতী ঘোষ। তাঁর চোখ দিয়েই নাকি সেইসময় জঙ্গলমহলকে দেখতেন তৃণমূল নেত্রী। বিজেপি, বাম ও কংগ্রেস নেতারা বলেন, ভারতী দেবীর নেতৃত্বেই সেইসময় বিরোধী কাউন্সিলারদের ভাঙিয়ে পুরবোর্ড দখল করেছিল তৃণমূল। আর প্রদীপ বলেন, ‘অন্য দল থেকে আসা কাউন্সিলাররা নতুন মুখ চেয়েছিলেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘চেয়ারম্যান হিসবে বৈদ্যুতিক চুল্লি, স্টেডিয়াম, অডিটোরিয়াম, দীর্ঘ ৭৫ বছরের খাসজঙ্গল জমি সমস্যার সমাধান করছিলাম। ওটি রোড সংস্কার করেছিলাম। হাসপাতালের উন্নয়ন ও শহরের যথাসম্ভব সৌন্দর্যায়নও করতে পেরেছিলাম।’ এর মাঝেই ২০১৯ সালের বিধানসভা উপনির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে খড়্গপুর সদরে তৃণমূলের প্রথম বিধায়কও হয়েছিলেন প্রদীপ সরকার। ২০২১ সালে অবশ্য বিজেপির হিরন্ময় চট্টোপাধ্যায়ের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে যান। ২০২২ সালে ফের তৃণমূল পরিচালিত পুরসভার চেয়ারম্যান হয়েছিলেন প্রদীপ। কিন্তু দলীয় কাউন্সিলারদের বিদ্রোহে মাত্র ৮ মাসের মধ্যেই সরতে হয় তাঁকে। বৃহস্পতিবার প্রদীপ বলেন, ‘এভাবেই বারবার অপমানিত হয়েছি আমি। পরে দিদি আমাকে এমকেডিএ-র ভাইস চেয়ারম্যান করলেও সুজয় হাজরা, দীনেন রায়রা কাজ করতে দেননি। মদত ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।’ এবারের নির্বাচনে দিলীপ ঘোষের কাছে হেরে গিয়েও বারবার তাঁর প্রশংসা করেছেন প্রদীপ। পায়ে হাত দিয়ে প্রণামও করছেন। অগ্রজ দিলীপবাবুও অবশ্য বরাবরই প্রদীপকে নিজের ‘বন্ধু’ হিসেবেই তুলে ধরেন। তবে কি বন্ধুর হাত ধরে বিজেপিতেই যাচ্ছেন? প্রদীপ বলেন, ‘দেখা যাক।’ খড়্গপুর শহরের বিজেপি নেতারা অবশ্য প্রদীপের বিরুদ্ধে তীব্র বিষোদগার করেছেন। জেলা বিজেপির সহ সভাপতি তথা কাউন্সিলার অভিষেক আগরওয়াল বলেন, ‘সেই ২০১৫ সাল থেকে উনি অনেক অন্যায়, দুর্নীতি করেছেন। সব মনে রেখেছি আমরা। হিসেব হবে। তদন্তও হবে।’ কংগ্রেসের জেলা সভাপতি দেবাশিস ঘোষ বলেন, ‘উনি এমন একটা দল করতেন, যেটি রাজনৈতিক অস্তিত্বই হারানোর পথে।’ তবে কি নিভে যাবে প্রদীপ? অতীত স্মরণ করিয়ে শহরবাসী বলেন, সেটা তো সময়ই বলবে।