Bartaman Logo
২৫ জুন, ২০২৬
বর্তমান / কলকাতা

কাউন্সিলারদের ইমেজের কারণেই কি ধাক্কা? তৃণমূলের পরাজয়ে শুরু বিশ্লেষণ

২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের রায় যেন ‘ট্রেলার’ ছিল। আর তার পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি দেখা গেল ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে। সতর্কবার্তা এসেছিল আগেই। কিন্তু তা কানে তোলেননি বারাসত শহরের নেতারা।

কাউন্সিলারদের ইমেজের কারণেই কি ধাক্কা? তৃণমূলের পরাজয়ে শুরু বিশ্লেষণ
  • ৭ মে, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের রায় যেন ‘ট্রেলার’ ছিল। আর তার পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি দেখা গেল ২০২৬-এর বিধানসভা ভোটে। সতর্কবার্তা এসেছিল আগেই। কিন্তু তা কানে তোলেননি বারাসত শহরের নেতারা। সেই অমনোযোগ ও আত্মতুষ্টির মূল্যই চোকাতে হল বারাসতের তৃণমূলকে। শহরই শেষ পর্যন্ত ডুবিয়ে দিল ঘাসফুলকে। বারাসত বিধানসভায় তৃণমূলের বিপর্যয় নিয়ে এমনই চুলচেরা বিশ্লেষণ উঠে এসেছে বলেই মনে করছে দলীয় নেতৃত্বের একাংশ। ২০১১ সাল থেকে বারাসতে তৃণমূলের বিধায়ক ছিলেন অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী। কিন্তু এবার তাঁকে টিকিট দেয়নি দল। এবার জেলা সদর বারাসাত আসনে কার্যত গোহারা হয়েছেন জোড়াফুলের প্রার্থী সব্যসাচী দত্ত। শহরের প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডে ভাঙন, সংগঠনের ভিত যে কতটা নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল, তার স্পষ্ট প্রতিফলন মিলেছে। ৩৪ হাজার ৫৫৮ ভোটে জয়ী বিজেপির শংকর চট্টোপাধ্যায়। ‘ভূমিপুত্র’ ইমেজ এবং এলাকায় দীর্ঘদিনের সংযোগকে পুঁজি করেই তিনি এই ব্যবধান গড়ে তুলেছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাঁর বিপরীতে তৃণমূলের সব্যসাচী দত্ত বারাসতের বাইরের বাসিন্দা। এই ‘স্থানীয় বনাম দূরত্ব’ ইস্যু ভোটের মেরুকরণে নীরব ভূমিকা নিয়েছে বলেই ইঙ্গিত মিলেছে বিশ্লেষণে। কিন্তু ফলাফলের ‘আসল চাবিকাঠি’ লুকিয়ে শহরের ভিতরেই। বিশ্লেষণে বারবার উঠে আসছে কাউন্সিলারদের ভূমিকা। অভিযোগ, ক্ষমতায় আসার পর রাতারাতি আর্থিক উত্থান, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি, সম্পত্তি বৃদ্ধি, নামে-বেনামে সম্পত্তি তৈরি— এসবই সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। তার থেকেও বড়ো হল, আচরণগত পরিবর্তন। একসময় ‘নিজের লোক’ বলে পরিচিত প্রতিনিধিরা ধীরে ধীরে নাগালের বাইরে চলে গিয়েছেন এমন অভিযোগ একাধিক ওয়ার্ডে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব বেড়েছে তাঁদের, ব্যবহারে এসেছে ঔদ্ধত্য। অনেকে অভিযোগ জানাতে গিয়েও অনেক ক্ষেত্রে সাড়া পাননি। ফলে রাজনৈতিক সম্পর্কের জায়গায় তৈরি হয়েছে অবিশ্বাসের দেওয়াল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রভাবের রাজনীতি। জেলার শীর্ষ নেতৃত্বের নাম ভাঙিয়ে এলাকায় দাপাদাপি, প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ— এসব বিষয় শহুরে ভোটারদের একাংশ মোটেই ভালোভাবে নেয়নি। বরং এই সংস্কৃতিই আরও জোরদার করেছে সিন্ডিকেটের প্রভাব, জমি দখল, প্রোমোটিংয়ে মদত, ক্লাব দখল বা জলাশয় ভরাটের মতো বিতর্ককে। এই ক্ষেত্রে স্থানীয় কাউন্সিলারদের প্রত্যক্ষ মদত ছিল বলেই অভিযোগ নাগরিকদের। পুর পরিষেবার চিত্র এই ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। কাউন্সিলারের দেখা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা, কাজের সুরাহা না হওয়া, প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট পেতে ভোগান্তি— এই অভিজ্ঞতা শহরের বহু মানুষের। ফলে জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বেড়েছে। যা শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্নতার রূপ নিয়েছে।

Advertisement

২০২৪ সালের সতর্কবার্তাকে উপেক্ষা করে এবার প্রার্থী নির্বাচন, জনসংযোগের অভাব এবং সংগঠনের ভিতরে জমে থাকা অসন্তোষকে অগ্রাহ্য করার ফলই এই ভরাডুবি—এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একাংশ। তৃণমূল নেতৃত্ব অবশ্য এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। বিজেপি বিধায়ক শংকর চট্টোপাধ্যায় বলেন, মানুষ তৃণমূলের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। ওয়ার্ডের মানুষ এতদিন কীভাবে দিন কাটিয়েছেন, তা প্রচার করতে গিয়ে বুঝেছি। এবার মানুষ মুক্ত হলেন।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ