বিশ্বজিৎ দাস, কলকাতা: কাতারে কাতারে ইমার্জেন্সি রোগী ভরতি হচ্ছেন রোজ। চোট-আঘাত পাওয়া, পথ দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম মানুষজন। সুস্থ হচ্ছেন, বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু আর জি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের যে আটতলা ট্রমা সেন্টারের বেডে তাঁরা ভরতি হচ্ছেন, সেই বেডগুলির কোনো সরকারি অনুমোদন নেই! হাসপাতাল সূত্রেই জানা গিয়েছে এহেন বিস্ফোরক তথ্য। আটতলা এই বাড়িতে বর্তমানে ২১৭টি বেড আছে। এই বাড়ির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় বাম আমলের শেষের দিকে। তৃণমূল আমলে, ২০১৫ সালে অল্প কিছু শয্যা নিয়ে চালু হয় পরিষেবা। ২০১৭ সালে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়। তারপর গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গিয়েছে। পালাবদলের পর রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কিন্তু বাম জমানার শেষ এক বছর বা তৃণমূল জমানার দীর্ঘ ১৫ বছরে এই ট্রমা সেন্টারের ২১৭টি বেড সরকারি অনুমোদন পেল না কেন? নতুন সরকারই বা কেন জরুরি পদক্ষেপ করছে না? ওই বেডগুলির না আছে প্রশাসনিক অস্তিত্ব, না আছে আর্থিক অনুমোদন। তাহলে বাড়িটিও কি ‘বেআইনি’? প্রশ্ন উঠেছে।
স্বাস্থ্যদপ্তর সূত্রে খবর, শুধু ট্রমা সেন্টারের ২১৭টি বেডই নয়, আর জি করের পাঁচশোর কাছাকাছি বেডের কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। নিকু, পিকু, হাইব্রিড সিসিইউ’র মতো জরুরি বেডও রয়েছে এই তালিকায়। সব মিলিয়ে ২,০০৩টি বেডের মধ্যে ১৫০০ বেডের অনুমোদন আছে। তৃণমূল জমানায় স্বাস্থ্যদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এক আধিকারিক বলেন, ‘বাড়িটির হয়তো অনুমোদন আছে। কিন্তু বেডগুলির অনুমোদন আছে কি না, খোঁজ নিতে হবে।’ স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, বছরের পর বছর ধরে সেখানে যে লক্ষ লক্ষ রোগী চিকিৎসা পাচ্ছেন, সরকারি রেকর্ডে যাঁদের নাম ও রোগের বিবরণ উঠছে, তাঁদের তো তাহলে বাস্তবে ‘অস্তিত্ব’ই নেই! কারণ, বেডের সরকারি অনুমোদন না থাকলে রোগীদের কি থাকে? আর জি কর হাসপাতালের সুপার ও উপাধ্যক্ষ ডাঃ সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘ট্রমা সেন্টারের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনুমোদন নেই। ওই বেডগুলিকে আইনি স্বীকৃতি দিতে বিগত জমানায় বহুবার স্বাস্থ্যদপ্তরে অনুরোধ জানিয়েছি। কিছু হয়নি।’ তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
এই অদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বহুবার আর জি কর থেকে ই-ফাইলও তোলা হয়েছে। কোনো লাভই নাকি হয়নি! স্বাস্থ্যদপ্তরের প্রধান সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম বলেন, ‘বিষয়টি খোঁজ নেব। তবে যদি প্রশাসনিক ও আর্থিক অনুমোদনই না থাকে, বাড়িটি কীভাবে হল? দেখছি ব্যাপারটা।’
বর্তমানে এখানকার একতলায় ট্রমা ও জেনারেল ইমার্জেন্সি বিভাগ রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন অংশে রয়েছে নিউরোলজি, নিউরোসার্জারি, অর্থোপেডিক, সার্জারি, অ্যানাসথেসিওলজি প্রভৃতি বিভাগ। পাঁচ, সাত ও আটতলায় ওয়ার্ড, ছ’তলায় এইচডিইউ ইত্যাদি বিভাগ। ট্রমা সেন্টারের একটি বেডেরও আর্থিক অনুমোদন না থাকায় সুনির্দিষ্টভাবে এই বাড়িটির জন্য কোনো কর্মী-চিকিৎসক নিয়োগও করতে পারছে না হাসপাতাল। যাঁরা কাজ করছেন, অন্য বিভাগ থেকে তাঁদের এখানে নিয়ে আসা হচ্ছে।