‘যদি স্বর্গ থাকে, সেখানে এক গ্লাস মদ যেন অপেক্ষা করে। আর যদি নরক থাকে, আমি তার জন্য আগেই অনুশীলন করেছি।’ প্রেমে বারবার আঘাত। মদে তীব্র আসক্তি। দিনে চার বোতল মদের ফল ফলতে শুরু করে দিয়েছে ততদিনে। মেরুদণ্ডে স্ফটিকের মতো জমেছে অ্যালকোহল। বিদ্রোহ ঘোষণা করে দিয়ে লিভার জানিয়ে যাচ্ছে, আর নেওয়া সম্ভব নয়। বন্ধু, সহ অভিনেতা পিটার ও টুল বললেন, ‘ও হুইস্কি খায় না। হুইস্কি ওকে খায়।’ ১৯৭৩ সালে ডাক্তার বললেন—‘মদ ছাড়তেই হবে, না হলে পাঁচ বছরের মধ্যে মৃত্যু নিশ্চিত।’ তারপর রিচার্ড বার্টনের অমর উক্তি, ‘আমি জানি এটা আমাকে মেরে ফেলছে, কিন্তু মৃত্যুর এ কেমন সুন্দর উপায়।’
প্রেম, আঘাত, মদ-রিচার্ড বার্টন কি বাঙালির কাছে ইংরেজি বলা দেবদাস?
মৃত্যুর অনেক পর ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘দ্য রিচার্ড বার্টন ডায়ারিস’। তার ছত্রে ছত্রে নিজস্ব জটিল মনোজগৎ, সাহিত্যঋদ্ধ মনন, একাকিত্ব, আত্মধ্বংসের ছায়া। বারবার প্রেমে পড়া। ভালোবাসা বারবার ভাঙা। আর, আরও মদ, আরও একা, ভেঙে চুরচুর হতে থাকা একলা এক মানুষ। ততদিনে গোটা পৃথিবীর পরিচয় হয়ে গিয়েছে অভিনেতা, সাহিত্যপ্রেমী, শেক্সপিয়র বিশেষজ্ঞ এবং কবি বার্টনের সঙ্গে। ততদিনে, ১৯৬৪ সালের রেকর্ডটি হয়ে গিয়েছে। হ্যামলেট নাটক ব্রডওয়ের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে চলে তৈরি করে ফেলেছে ইতিহাস, মোট ১৩৭ শো। দৈনিক ১০০ সিগারেট সত্ত্বেও বজ্রের মতো ঋজু, মেঘমন্দ্র কণ্ঠস্বর। শেক্সপিয়রের সংলাপ বলার অলৌকিক নৈপুণ্য। ইংরেজি কাব্যে বিপুল জ্ঞান। এই সব মিলিয়েই তিনি রিচার্ড বার্টন।
ততদিনে ক্যালেন্ডার দেখে ফেলছে ১৯৬৮ সাল। কিছুদিনের মধ্যে বাঙালি ‘হোয়্যার ইগলস ডেয়ার’ দেখবে। অতঃপর বার্টন হবেন এমনই এক নায়ক, যিনি সাহসী, রোমান্টিক, চিন্তাশীল। পেশিবহুল শুধু নন মস্তিষ্ক ও হৃদয়সম্পন্ন। আর বাস্তবে শিক্ষিত, কবিমনস্ক এবং ভাঙা মনের এক রোমান্টিক। এলিজাবেথ টেলরের সঙ্গে তীব্র প্রেম। বিয়ে ভাঙা। আবার বিয়ে। ততদিনে কাগজ পড়ে এসব গুলে খেয়ে ফেলেছে কলকাতা। যেমন উত্তম কুমার বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় তেমনই বার্টন হয়ে উঠলেন বুদ্ধিজীবী প্রেমিক। যিনি প্রেমে তীব্র, চিন্তায় গভীর। গ্রেগরি পেক, গ্যারি কুপার, ক্লিন্ট ইস্টউড, শন কোনারি, চার্লটন হেস্টনের মতো গভীরভাবে রিচার্ডকেও আপন করে নিল বাংলা। সাধে কি আর তাঁর জন্মের ১০০ বছর পর ‘কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’এ সম্মান জানানো হয় তাঁকে! তাঁর ‘হু’জ অ্যাফ্রেইড অফ ভার্জিনিয়া উলফ’ দেখানো হবে উৎসবে। ৭ নভেম্বর। সকাল ১১টা। রবীন্দ্র ওকাকুরা ভবন।
দ্য নাইট অফ দ্য ইগুয়ানা, অ্যান অফ দ্য থাউজান্ড ডে’জ, বেকেট চূড়ান্ত হিট। বিশ্বের অন্যতম সেরা অভিনেতা হিসেবে স্বীকৃতি। পারিশ্রমিকের দিক থেকে ছাপিয়ে যাচ্ছেন বাদবাকিদের।
স্ত্রী এলিজাবেথের জন্য নিলামে কিনলেন বিশাল হীরে। ১৯৬৮ সালে রত্নটির দাম এক মিলিয়ন। পাথরটি বিখ্যাত, ‘বার্টন কার্টিয়ের ডায়মন্ড’ নামে। সেই এলিজাবেথ টেলর ও রিচার্ড বার্টন একসঙ্গে প্রায় ১১টি ছবিতে অভিনয় করেন। তারই একটি ‘হু’জ অ্যাফ্রেইড অফ ভার্জিনিয়া উলফ’। সিনেমাবোদ্ধাদের অনেকে বলেন, ‘দু’জনের সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রতিফলন আছে ছবিটিতে।’ রিচার্ড ও টেলর দু’জনেই ছবিটিতে অভিনয়ের কারণে অস্কারের জন্য মনোনীত। টেলর পুরস্কার পেলেন। রিচার্ড পেলেন না। বস্তুত সাত-সাতবার অস্কার মনোনয়ন পেয়েছিলেন বার্টন। একবারও পাননি।
কিন্তু তিনি তো রিচার্ড বার্টন। তাই অস্কার না পেলেও তাঁর কবরের ফলকে খোদাই থাকে, ‘এখানে আমরা এক রাজাকে সমাধিস্থ করেছি।’
তাঁর সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে ৭ নভেম্বর। সকাল ১১টা।