


জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। গত শনিবার ১৮ এপ্রিল এই খবরে সকাল থেকেই নড়েচড়ে বসেছিল দেশবাসী। ঠিক তার আগের সন্ধ্যায় লোকসভায় আসন বাড়িয়ে মহিলাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের বিল বিরোধীদের সম্মিলিত বাধায় আটকে গিয়েছে। ফলে পরাজয়ের জ্বালা মেটাতে নতুন কোনো ঘোষণা তিনি করবেন, নাকি নোটবাতিল, লকডাউনে থালা-বাসন বাজানোর মতো কোনো বোমা ফাটাবেন—তা নিয়ে দিনভর পারদ চড়তে থাকে। অবশেষে শনিবার রাত সাড়ে আটটায় ব্যাকড্রপে জাতীয় পতাকাকে সাক্ষী রেখে দূরদর্শন, সংসদ টিভিসহ সমস্ত সরকারি গণমাধ্যমে আবির্ভূত হন তিনি। তারপর আধঘণ্টার ভাষণে সংবিধান সংশোধনী বিল আটকে দেওয়ার জন্য বিরোধীদের তুলোধনা করেন। মোদির বক্তব্যের মূল সুর ছিল, মহিলা সংরক্ষণের বিরোধী বিরোধীরা। তারা যেন ভ্রূণহত্যার মতো অপরাধ করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনের জন্য আদর্শ আচরণবিধি এখন জারি রয়েছে, তা সত্ত্বেও সরকারি প্রচার যন্ত্রের মাধ্যমে বিরোধীদের অভিযুক্ত করে কী করে জনমত প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন প্রধানমন্ত্রী? বিশেষত এই সুযোগ যখন বিরোধীদের কাছে নেই। ভোটের মুখে প্রধানমন্ত্রীর এমন গুরুতর আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে দুই বাম দল। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার কথাও জানিয়েছেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহিলাদের জন্য এক তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণের বিলটি তিন বছর আগে পাস হলেও মোদি সরকার তিন বছর ঘুমিয়েই কাটিয়েছে। আর ঠিক ভোটের মুখে মহিলাদের মন জয়ের চেষ্টায় সংসদে মহিলা সংরক্ষণের প্রসঙ্গটি টেনে এনে ডিলিমিটেশনের প্রচেষ্টা চালিয়েছে। যা বিরোধীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিহত হয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদির বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ অবশ্য এই প্রথম নয়। যেমন, ২০১৯ সালে লোকসভা ভোটের ঠিক আগে জাতির উদ্দেশে ‘অ্যান্টি স্যাটেলাইট’ পরীক্ষায় সাফল্য ঘোষণা করেছিলেন তিনি, যা আসলে সরকারি কাজ। আবার ২০২৪-এ ভোটের আগে কংগ্রেসের ইস্তাহার নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কংগ্রেস ক্ষমতায় এলে মঙ্গলসূত্র পর্যন্ত কেড়ে নেবে।’ তাঁর বিরুদ্ধে বিভাজনমূলক ও আপত্তিকর মন্তব্যের অভিযোগ জমা পড়ে কমিশনে। ওই বছরেই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প নিয়ে মোদির চিঠি পৌঁছায় ভোটারদের কাছে। অভিযোগ ওঠে, সরকারি তহবিল প্রচারের কাজে ব্যবহার করা নিয়েও। নিজের কেন্দ্র বারাণসীতে মনোনয়নপত্র জমার দিন কী করে তার ‘লাইভ টেলিকাস্ট’ করে সরকারি গণমাধ্যমে, তা নিয়ে বিধিভঙ্গের অভিযোগ ওঠে। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগে মোদির ধ্যানের কর্মসূচির লাইভ টেলিকাস্ট নিয়েও ভোটারদের প্রভাবিত করার গুরুতর অভিযোগ ওঠে। বলাই বাহুল্য, প্রায় কোনো ক্ষেত্রেই মোদির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি নির্বাচন কমিশন। শুধু একবার মোদির জন্য বিজেপির সভাপতিকে নোটিস দিয়েছিল কমিশন। আর ২০১৯-এ বালাকোটে সার্জিক্যাল স্ট্রাইক-এর সাফল্যকে ভোটের প্রচারের কাজে লাগানোয় নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে ১১টি অভিযোগ জমা পড়ে। সবকটিতেই তাঁকে ‘ক্লিনচিট’ দেয় কমিশন। সেই সময় একজন কমিশনার ভিন্ন মত পোষণ করায় পরবর্তীকালে তাঁর পরিবারকে চরম হেনস্তা করে মোদি সরকার।
এমন নয় যে আদর্শ আচরণবিধি জারি থাকাকালীন প্রার্থী বা নেতারা তা লঙ্ঘন করলে কমিশন কোনো ব্যবস্থা নেয় না। অতীতে দেখা গিয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে আচরণবিধি লঙ্ঘনের কারণে যোগী আদিত্যনাথ, মায়াবতীর মতো নেতাদের ৭২ ঘণ্টা প্রচার নিষিদ্ধ করে দিয়েছে কমিশন। কিন্তু মোদি, এমনকি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপে করার সাহস দেখায়নি তারা। ফলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন ওঠে। কারণ সাময়িকভাবে মায়াবতীদের প্রচার নিষিদ্ধ হলেও মোদি ‘ক্লিনচিট’ পান! অনেকের মতে, কমিশনের হাতে নিন্দা করা, সতর্ক করা, প্রচার নিষিদ্ধ করা ছাড়া জেল-জরিমানা-ব্যান করার কোনো ক্ষমতাই নেই। কিন্তু যেটুকু আছে তা ব্যবহার করে নিরপেক্ষ থাকার বার্তা দেওয়ারও কোনো সদিচ্ছা আজ পর্যন্ত দেখায়নি কোনো কমিশন। ফলে জাতির উদ্দেশে ভাষণের আড়ালে সরকারি গণমাধ্যমকে কৌশলে রাজনৈতিক প্রচার মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করে মোদি তথা প্রধানমন্ত্রী যে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, তা দিনের আলোর মতোই স্পষ্ট বলে অনেকেই মনে করছেন। কিন্তু কমিশন তা বুঝলে তো! তাদের নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে ন্যূনতম ব্যবস্থা নেওয়ার হিম্মত দেখাবে কমিশন— এবারেও সেই আশা দুরাশা হয়ে থাকার সম্ভাবনাই বেশি।