


মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের গনগনে আঁচ গৃহস্থের হেঁশেলে পৌঁছে গিয়েছে আগেই। যুদ্ধ দিনকয়েক গড়াতেই সিলিন্ডার প্রতি গ্যাসের দাম ৬০ টাকা বাড়িয়ে দিয়েছে মোদি সরকার। গত শনিবার থেকে কলকাতাসহ রাজ্যের নানা জায়গা দেখেছে অন্য আতঙ্কেরও ছবি। গ্যাসের দোকানগুলিতে লম্বা লাইন। আগেভাগে সিলিন্ডার তুলে রাখার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। কিছু লোকের ভিতরে তুমুল বিভ্রান্তি সার্বিক পরিস্থিতিকে করে তুলেছে আরো জটিল। কারণ, গ্যাস ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে নির্দেশ এসেছে—একটি সিলিন্ডার ডেলিভারি থেকে পরবর্তী নতুন বুকিংয়ের মধ্যে ব্যবধান থাকতে হবে অন্তত ২৫ দিনের! কিন্তু সাধারণ মানুষের উদ্দেশে সরকার বা প্রশাসনের তরফে এনিয়ে কোনো বার্তা বা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অনেকে ফোনের মাধ্যমে (মিসড কল বা আইভিআরএস) সিলিন্ডার বুকিং করতে পারেননি। কিছু গ্রাহক পুরানো পদ্ধতিতে বুকিং করতে না-পারায় আতঙ্ক বহুবর্ধিত হয়েছে। সকাল সকাল তাঁরাই উদ্বেগের সঙ্গে ছুটে গিয়েছেন ডিস্ট্রিবিউটরের অফিসে। অনেক গ্রাহকের আশঙ্কা, এই নয়া ফরমানে তাঁদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে না তো?
প্রায় প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যের চড়া দাম নিয়ে গৃহস্থের যখন নাজেহাল অবস্থা তখনই এসে চাপল এলপিজি সংগ্রহ সংক্রান্ত খারাপ খবর। দেশবাসীকে স্বস্তি দিতে ৬ মার্চ সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় পেট্রলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী দাবি করেন, যুদ্ধের কারণে ভারতে জ্বালানির কোনো সংকট নেই। দেশে যথেষ্ট মজুত এবং সরবরাহ আছে। আম জনতার চিন্তার কারণ নেই। কিন্তু কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর এত বড়ো আশ্বাসবাণীও নস্যাৎ হয়ে গেল অতিদ্রুত। সন্ধ্যায় মন্ত্রী মহোদয়ের এই ঘোষণার ঘণ্টা কয়েক পর, সেদিন রাতেই কিন্তু এলপিজির দামবৃদ্ধির দুঃসংবাদ শোনানো হয়েছিল। সিলিন্ডার প্রতি বাড়তি ৬০ টাকা অনেকের জন্যই চাপ, তার উপর চেপেছে সিলিন্ডার সংগ্রহের অনিশ্চয়তা। সোজা কথায়, রান্নার গ্যাস নিয়ে কোনো স্বস্তির খবর আপাতত নেই। সরকার বাহাদুরের আশ্বাসবাণী শেষ এখানেই নয়। সোমবার লোকসভায় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম বাড়লেও ভারতের বাজারে তার প্রভাব খুব একটা হবে না। অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যের মধ্যে ‘খুব একটা’ শব্দবন্ধের তাৎপর্য নিয়ে আম জনতার কপালে কিন্তু চিন্তার ভাঁজ পড়ে গিয়েছে। এই মন্তব্যের মধ্যে ভরসার চেয়ে ভয়ই বেশি খুঁজে পেয়েছেন অনেকে। কারণ মোদি জমানায় গরিব ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির অভিজ্ঞতা ঘর পোড়া গোরুর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। দুই হেভিওয়েট মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরী এবং নির্মলা সীতারামনের কথায় তাঁরা সিঁদুরে মেঘই দেখেছেন। সবার মনে এই আশঙ্কাই বদ্ধমূল হচ্ছে যে, রান্নার গ্যাসের পর কি এবার পেট্রল-ডিজেলের পালা? দাম বাড়তে চলেছে এই দুটি অত্যাবশ্যক পেট্রপণ্যেরও? এই উদ্বেগে ইন্ধন দিয়েছে অর্থমন্ত্রীর আরো একটি মন্তব্য, এখন আমরা কিন্তু আর আগের মতো কম দামে অশোধিত তেল কিনছি না! ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত সময়সীমায় ব্যারেল প্রতি জ্বালানির ক্রয়মূল্য ৬৯.০১ ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ৮০.১৬ ডলার।
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যে ঊহ্য থাকলেও আরো একটি খারাপ খবর হল, ২ মার্চের পর আন্তর্জাতিক বাজারে অশোধিত তেলের দাম আরো বেড়েছে। ব্যারেল প্রতি দাম এই মুহূর্তে প্রায় ১০০ ডলার। তাই দেশবাসী একটা উত্তর খুঁজছে, খুচরো বাজারে পেট্রল-ডিজেলের দাম কবে থেকে এবং কত টাকা হারে বাড়বে? আন্তর্জাতিক বাজারে দামবৃদ্ধির দোহাই কবে দেবে সরকার? আন্তর্জাতিক বাজারে দামবৃদ্ধির কোন সীমা পর্যন্ত সরকার রেয়াত করবে? অর্থমন্ত্রীর এই সংক্রান্ত মন্তব্যটি পেট্রল-ডিজেলের দামবৃদ্ধির পথ প্রশস্ত রাখার কৌশল মাত্র বলেই মনে হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, এলপিজির পর কি এবার পেট্রল-ডিজেলও মহার্ঘ হওয়ার প্রহর? তাহলে ‘জ্বালানি সংকট নেই’ বিবৃতির সত্যতা কোথায়? সরকার যেন ভুলে না যায়, যখন কোম্পানিগুলি যথেষ্ট সস্তায় তেল ও গ্যাস কিনেছিল তার সমান সুবিধা কিন্তু নাগরিকদের দেওয়া হয়নি। মূল আর্থিক সুবিধা নিয়েছে দেশীয় তেল সংস্থাগুলি এবং সরকারের কোষাগার। তাই এখনই আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত দিলে তা হবে অনৈতিক। আর এর বিরূপ প্রভাব পড়বে সমগ্র অর্থনীতির উপর। কেননা, তাতে পরিবহণ খরচ বেড়ে যাবে এবং সেই সূত্রে আগুন লাগবে প্রতিটি জিনিসের দামে। তার দরুন উৎপাদন এবং বাজার সংকুচিত হলে ধাক্কা খাবে কর্মসংস্থান। দীর্ঘতর হবে বেকার এবং পরিযায়ী শ্রমিকের মিছিল। তাই পেট্রল-ডিজেল, রান্নার গ্যাসসহ যাবতীয় পেট্রপণ্য সাধারণের সাধ্যের মধ্যে রাখতে মোদি সরকারকে অবিলম্বে বিশেষ নীতি নিতে হবে।