


নিজস্ব প্রতিনিধি, নয়াদিল্লি: ভারতের আমন্ত্রণে ২০ দিন আগে বিশাখাপত্তনম বন্দরে এসেছিল ইরানের রণতরী ‘আইআরআইএস ডেনা’। অংশগ্রহণ করেছিল সেখানে আয়োজিত আন্তর্জাতিক যুদ্ধজাহাজ মহড়া রিভিউ কর্মসূচিতে। প্রোটোকলের অঙ্গ হিসেবে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সেই কর্মসূচির প্রাক্কালে আগত সব যুদ্ধজাহাজ পরিদর্শন করেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। বুধবার ভোরে বিশাখাপত্তনম থেকে ফেরার পথে ইরানের সেই রণতরীকেই ভারত মহাসাগরে ডুবিয়ে দিয়েছে আমেরিকার নৌশক্তি। ভারত ও শ্রীলঙ্কার নাকের ডগায় মার্কিন সাবমেরিনের মাধ্যমে টর্পেডো ছুড়ে ধ্বংস করা হয় মজ-ক্লাস ফ্রিগেট ‘আইআরআইএস ডেনা’কে। তলিয়ে যাওয়ার সময় তাতে ছিলেন তেহরানের নৌবাহিনীর অন্তত ১৮০ জন নাবিক, সেনা ও কর্মী। যুদ্ধজাহাজ থেকে বিপদ সংকেত পেয়ে তৎপর হয় শ্রীলঙ্কা সরকার। উদ্ধার করা হয় ৩২ জনকে। অন্তত ৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। শ্রীলঙ্কার উপকূলবর্তী শহর গল থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরত্বে এই ঘটনায় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, এবার ভারতের শিয়রে এসে পৌঁছে গেল পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ। আমেরিকা সম্পূর্ণ বিনা নোটিসে, শ্রীলঙ্কা অথবা ভারতকে না জানিয়েই এই অপারেশন চালিয়েছে ভারত মহাসাগরে। যদিও আমেরিকার দাবি, আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় এই আক্রমণ করা হয়েছে। কোনো রীতি লঙ্ঘন হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজকে মার্কিন নৌসেনার সাবমেরিন টর্পেডো ছুড়ে ধ্বংস করেছে। এভাবে ইরানের রণতরীগুলিকে টার্গেট করা যে চলবে, সেকথা এদিন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেট ।
গত ১৮-২৫ ফেব্রুয়ারি বিশাখাপত্তনমে বঙ্গোপসাগরে ভারতের নৌবাহিনী আয়োজন করেছিল ওই ইন্টারন্যাশনাল ফ্লিট রিভিউ কর্মসূচি। সেখানে যোগ দিতে আসা ইরানের এই যুদ্ধজাহাজকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিল ভারতীয় নৌবাহিনীর ইস্টার্ন নেভাল কমান্ড। বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, এই যুদ্ধজাহাজের আগমন ভারত ও ইরানের দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক মৈত্রীর প্রতীক। সেই রণতরীটিকে ভারত মহাসাগরের বুকে ধ্বংস করার মাধ্যমে আমেরিকা বস্তুত পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধকে দক্ষিণ এশিয়ায় সম্প্রসারিত করার ইঙ্গিত দিল। যেখানে এই আক্রমণ হয়েছে, সেটি আন্তর্জাতিক জলপথ হলেও শ্রীলঙ্কা ও ভারতের শিয়রে। অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া সহ মোট ৭৪টি দেশের যুদ্ধজাহাজ অংশ নিয়েছিল বিশাখাপত্তনমের মহড়ায়। সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ হল, মার্কিন নৌবাহিনীর গাইডেড মিসাইল ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস পিঙ্কেনিরও সেখানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে শেষ মুহূর্তে আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তর ভারতকে জানায়, তারা যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে পারছে না। অর্থাৎ, ফেব্রুয়ারি মাসেই ইরানের রণতরীর পাশে নিজেদের যুদ্ধজাহাজকে রাখতে রাজি হয়নি আমেরিকা। ২৮ ফেব্রুয়ারির পর স্পষ্ট হয়েছে সেই কারণ। অর্থাৎ, ইরানকে আক্রমণ করার পর। কিন্তু, ভারতের কাছে সামান্যতম আন্দাজও ছিল না যে, বিশাখাপত্তনম থেকে ফিরতি পথে ইরানের যুদ্ধজাহাজকে টার্গেট করবে মার্কিন সরকার। আর সেটা ভারতের সমুদ্রসীমার অদূরেই।
ইরানের যে যুদ্ধজাহাজকে ধ্বংস করেছে আমেরিকা, সেটি ছিল ১৫০০ টন ওজনের ৯৪ মিটার দীর্ঘ এক অ্যান্টি শিপ মিসাইল, অ্যান্টি টর্পেডোয়িক ফ্রিগেট। অথচ আমেরিকার সাবমেরিনের নিক্ষেপ করা টর্পেডো সেটি সামলাতে পারেনি। শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর যে দু’টি যুদ্ধজাহাজ ওই ধ্বংস হওয়া ‘আইআরআইএস ডেনা’-র ৩২ জন নাবিক ও সেনাকে উদ্ধার করেছে, সেই নান্দীমিত্র ও সাগরও অংশ নিয়েছিল বিশাখাপত্তনমের মহড়ায়।
ভারত মহাসাগরের বুকে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিতেই তৎপর হয়ে উঠেছে ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক। হাই অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে নৌবাহিনীকে। তিন সাগরে ‘স্ট্যান্ড বাই’ রাখা হয়েছে নৌশক্তির যাবতীয় যুদ্ধজাহাজকে। যেখানে যুদ্ধ হচ্ছে, সেই পারস্য উপসাগর থেকে ভারত মহাসাগরের দূরত্ব ৪ হাজার কিমি। এর অর্থ, ভারত মহাসাগরে মার্কিন সাবমেরিন বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে আগে থেকেই। উপসাগরীয় যুদ্ধ নয়, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নয়, ট্রাম্পের যুদ্ধ ছড়াচ্ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও! আর কোথায় কোথায় গোপনে পৌঁছেছে মার্কিন সাবমেরিন?