


সুব্রত ধর, শিলিগুড়ি: ‘থ্রেট কালচার’! দীর্ঘ আট বছর ধরে মিনি সচিবালয় ‘উত্তরকন্যায়’ চলছে হুমকির সংস্কৃতি। অভিযোগ, বেপরোয়াভাবে সচিবালয়ে ছড়ি ঘোরাতেন প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় থাকা একাংশ কর্মী। তাঁদের কথা না শুনলেই সাধারণ কর্মীদের বদলির হুমকি দেওয়া হত। এক্ষেত্রে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-নেত্রী ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রীদের নাম ব্যবহার করা হত। রাজ্যে পালাবদল হতেই বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলছেন সচিবালয়ের সাধারণ কর্মীদের একাংশ। একই সঙ্গে তাঁরা ভেঙে দিয়েছেন তৃণমূলের ওয়েস্ট বেঙ্গল রাজ্য সরকারি কর্মচারি ফেডারেশনের সচিবালয় ইউনিট। তৃণমূল নেতারা অবশ্য অভিযোগ মানতে নারাজ। সমগ্র বিষয় ঘিরে সচিবালয়ের অন্দরে চলছে জোর চর্চা। ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির বিধায়ক বিজেপির শিখা চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তৃণমূল জমানায় উত্তরকন্যায় কর্মসংস্কৃতি লাটে উঠেছিল। জন্ম নিয়েছিল থ্রেট কালচারের। প্রভাবশালীদের হাত মাথায় থাকা একাংশ কর্মী এই কালচারের আমদানি করেছিলেন। আমাদের সরকার এই থ্রেট কালচারের অবসান ঘটাবে।
প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ বলেন, যখন হুমকি দেওয়া হয়েছে, তখন কোনো কর্মী অভিযোগ করেননি। রাজ্যে সরকার পরিবর্তন হতেই ওই অভিযোগ করা হচ্ছে। কেন? কারণ, কর্মীদের কেউ কেউ নিজেকে বড়ো বিজেপি প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। পরিবর্তনের পর এমন অভিযোগ ওঠেই। কাজেই এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।
প্রাক্তন মন্ত্রী যাই বলুন না কেন এখন মিনি সচিবালয়ের কর্মসংস্কৃতির হাল নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। রাজ্যে পালাবদল হতেই আড়ালে-আবডালে এ ব্যাপারে সরব হয়েছেন কর্মীদের একাংশ। যাঁরা তৃণমূলের সরকার কর্মচারী সংগঠন ফেডারেশনের সদস্য ছিলেন। ওই কর্মীরা বলেন, ২০১৪ সালে চালু হয় উত্তরকন্যা। প্রথম চার বছর তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। বছর সাত আট আগে এখানে এক কর্মী নিয়োগ হওয়ার পর ‘দাদাগিরি’ শুরু হয়। অভিযোগ, পিএসসির মাধ্যমে নিয়োগ হওয়া কর্মীদের পাত্তা না দিয়ে নিজেদের মর্জিমাফিক চলতে শুরু করেন একাংশ কর্মী। তাঁরা বিভিন্ন সময় উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের মন্ত্রী ও তৃণমূল নেতা-নেত্রীদের নাম নিয়ে শাসাতেন। ফেডারেশনের সদস্য পদ না নিলে বদলির হুমকি দিতেন। ওই কর্মীদের বিরুদ্ধে সচিবালয়ের আধিকারিকরাও কিছু বলার সাহস পেতেন না। উদয়ন গুহের পূর্বসূরী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের বক্তব্য,আমার সময় উত্তরবঙ্গ উন্নয়নদপ্তর সহ উত্তরকন্যায় কোথাও কোনও অনিয়ম হয়নি কাউকে কোনও চাপ দেওয়া হতো না। স্বাভাবিক নিয়মেই দপ্তর চলত।
মিনি সচিবালয়ে দপ্তরের সংখ্যা ২২টি। যারমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মুখ্যমন্ত্রীর অফিস, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তর, পেনশন ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের অফিস, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পদপ্তর। এরবাইরে খাদ্য, পরিবহণ, হাউজিং, বিপর্যয়, ডিআইজি পুলিশ সহ বিভিন্ন দপ্তর ছিল।
প্রশাসন সূত্রের খবর, এখানে পিএসসির মাধ্যমে ৩০, চুক্তিভিত্তিক ৩০ এবং মন্ত্রী কোটায় নিযুক্ত ১০-১২ জন কর্মী রয়েছেন। মন্ত্রীর অ্যাটেন্ডেন্ট হিসাবে ছ’মাস কাজ করার পরই কোটার কর্মীর গ্রুপ-ডি পদে নিয়োগপত্র পেতেন। তাঁরা স্বল্প সময়ে সহজেই আপার ডিভিশন ক্লার্ক পদে প্রোমোশন পান। ২০২৫ সালে এখানে তৃণমূলের রাজ্য সরকারি কর্মচারী ফেডারেশনের ইউনিট গড়েন। তাতে ৭৪ জন সদস্য ছিলেন। সভাপতি করা হয়েছিল উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের সেকশন অফিসারকে। তিনি পিএসসির ২০০৭’র ব্যাচের কর্মী। বিধানসভা ভোটের আগেই তাঁকে বদলি করা হয় কলকাতায়।
রাজ্যে পালাবদল হতেই কর্মীরা ফেডারেশনের সদস্যপদ ত্যাগ করেন। সংগঠনের সংশ্লিষ্ট ইউনিট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কর্মচারীদের বক্তব্য, সচিবালয়ে কর্মী সংখ্যা বাড়ানোর দাবি বহুবার রাজ্য সরকারের কাছে জানানো হলেও কোনো কাজ হয়নি। তাই ‘থ্রেট কালচারের’ অবসান ঘটিয়ে সচিবালয়কে নতুন চেহারা দেওয়ার দাবি রাজ্য সরকারের কাছে জানানো হবে।ইতিমধ্যে ওএসডি, প্রাক্তন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী ও রাষ্ট্রমন্ত্রীর দু’জন পার্সনাল অ্যাসিস্ট্যান্টকে বদলি করেছে বর্তমান সরকার। অবসরের পর উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরে থাকা আরএক অফিসারকেও ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। • উত্তরকন্যায় সংস্কারের কাজ চলছে। - নিজস্ব চিত্র।