


মৃণালকান্তি দাস: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে একরাশ যন্ত্রণা-আতঙ্ক নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন বীরভূমের সোনালি বিবি ও তাঁর পুত্র। গত বছর জুন মাসে দিল্লি থেকে অন্তঃসত্ত্বা সোনালি-সহ ছয় জনকে জোর করে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করেছিল মোদি সরকারের পুলিশ বাহিনী। সোনালি খাতুন, সুইটি খাতুন ও তাঁদের নাবালক সন্তান-সহ যাঁদের ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছিল, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল একটাই— তাঁরা বাংলাভাষী! শুধু এই অভিযোগে জোর করে দেশ থেকে বার করে দেওয়ার আগে সোনালিদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। সরকারের তরফে তাঁদের নাগরিকত্ব সন্ধানের চেষ্টাও করা হয়নি। সেদিন প্রশ্ন উঠেছিল, যাঁরা বাংলাভাষী মুসলিম, ভাষা ও ধর্ম বেছে বেছে কেবল তাঁদেরই কেন বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলা হবে? কোনো উত্তর মেলেনি বিজেপি নেতাদের তরফে।
এক সন্তানকে নিয়ে সোনালি খাতুন দেশে ফিরতে পারলেও, তাঁর স্বামী দানিশ শেখ এখনও বাংলাদেশে আটকে। মুক্তি পাননি আর এক পরিযায়ী শ্রমিক সুইটি বিবি ও তাঁর দুই সন্তান। ভারত থেকে বিতাড়িত হয়ে, বাংলাদেশে কারাবদ্ধ হয়ে সোনালি বিবিরা দেখিয়ে দিয়েছেন, মোদি জমানায় রাষ্ট্রের মানবতাহীন নীতির জাঁতাকলে কতখানি পিষ্ট, ধ্বস্ত হতে পারে বাঙালিদের জীবন। এ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই বিজেপির। ভোট প্রচারেও নয়। বরং এরপরও ‘লজ্জাহীন’ সংকল্পে বস্তাপচা অনুপ্রবেশ তত্ত্বের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছেন মোদি-অমিত শাহরা। অথচ, শাহের মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই সংসদের দাঁড়িয়ে হিসাব দিয়ে বলেছিলেন, গত ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫-এর ৩১ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে কত জন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছেন। জানানো হয়েছে, ২০২৩ সালে অনুপ্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন ১৫৪৭ জন। ২০২৪ সালে ১৬৯৪ জন এবং ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ৭২৩ জন। তাহলে কোটি কোটি অনুপ্রবেশের তত্ত্ব কোথা থেকে পাচ্ছেন মোদি-শাহরা? উত্তর নেই বিজেপির কাছে।
আসলে, দেশের বহু রাজ্যে আধিপত্য বিস্তার করলেও, বাংলায় এখনও তেমন দৃঢ় ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারেনি বিজেপি। এর প্রধান কারণ উদারপন্থী নাগরিক সমাজের সতর্ক ভূমিকা এবং মুসলিম সমাজের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ। এই ব্যর্থতা হিন্দুত্ববাদীদের আরও উদ্ধত ও বেপরোয়া করে তুলেছে। ফলে তারা রাজনৈতিক আক্রমণের সহজ টার্গেট হিসেবে বেছে নিয়েছে গরিব বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের, যাঁদের ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশি, রোহিঙ্গা বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসাবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর লক্ষ্য একদিকে মুসলিমদের রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা, অন্যদিকে বাঙালি হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা। এটাই আসলে হিন্দুত্ববাদীদের পুরানো ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’ প্রকল্পেরই বহিঃপ্রকাশ। তারই পরিণতিতে হিংসা বস্তুটি ক্রমে গা-সওয়া হয়ে ওঠে। কিছু দিন আগেও কি ভাবা গিয়েছিল, চিকেন প্যাটি বিক্রি করার ‘অপরাধ’-এ কলকাতার কেন্দ্রস্থলে কোনো ব্যক্তিকে গণপ্রহৃত হতে হবে? এবং তারপর গেরুয়া শিবিরের এক বাঙালি নেতা সেই গণপ্রহারের নায়ককে সর্বসমক্ষে পুরস্কারে বরণ করবেন? এভাবেই ভাষা, সংস্কৃতি, জীবিকা ও পরিচয়কে ধর্মীয় ছকে বন্দি করে রাজনৈতিক ক্ষমতা করায়ত্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে বিজেপি। বিদ্বেষ কোনো নতুন অনুভূতি নয়, কিন্তু সেই বিদ্বেষের খোলামেলা উদ্যাপন— এই বাংলায় এ এক নতুন ‘রাজনীতি’ বটে!
এই ‘কৃতিত্ব’ হিন্দুভারতের উদ্গাতাদের। ধর্মের টোটকায় তাঁরা দেশবাসীকে অন্ধ করে দিয়েছেন। ধর্মান্ধ না হলে বাংলায় লেখা সরকারি পরিচিতিপত্র নিয়ে ভিনরাজ্যের পুলিশ বলতে পারে, এটা বাংলাদেশি ভাষা, বাংলাদেশে চলে যাও? ধর্মান্ধ না হলে বিনা তদন্তে শ্রমজীবী মানুষদের ও তাঁদের পরিবারকে তুলে নিয়ে আটকে রাখে দিনের পর দিন? জোর করে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া যায়? ধর্মান্ধ না হলে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিককে পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়? বিদ্বেষ তো কেবল ব্যক্তির বা গোষ্ঠীর নয়, এই বিদ্বেষ যেন আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে সতত উৎসারিত। সেই কারণেই সম্প্রতি ভিনরাজ্যে প্রাণ হারিয়েছেন বাংলার ১২জন পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিক। অধিকাংশ আক্রমণই ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে। বাংলায় ভোট প্রচারে এসে কোনো বিজেপি নেতা এরজন্য একবারও অনুশোচনা করেননি। যেন বাঙালি শ্রমিকরা জন্মেছেন ক্রীতদাস হয়ে, তাদের সঙ্গে যা খুশি করা যায়! অথচ, এখন সেই বাংলায় এসে তাদেরই ভোট চাইছেন বিজেপি নেতারা। গণতন্ত্রের কী পরিহাস!
বহু ‘বাঙালি’ ভিনরাজ্যে কাজ করছে অনেক কাল ধরে। কিন্তু এতদিন পর এখন কেন তাদের উপর হিংসা নেমে আসছে? বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকদের সঙ্গে দিনের পর দিন যা ঘটেছে, তার মূলে যে তীব্র ক্রোধ, বিদ্বেষ, ঘৃণার বিষাক্ত প্রচার, কার দিকে তার অভিমুখ, সেটা আজ স্পষ্ট। এর মধ্যে যতটা ‘হিন্দি সাম্রাজ্যবাদ’, ততটাই, বা তার থেকে বেশি ‘হিন্দু সাম্রাজ্যবাদ’। এই ভাবনা থেকেই দিল্লিতে অমিত মালব্য বলেন, বাংলা বলে কোনো ভাষা নেই, আছে কেবল বাংলাদেশি ভাষা। গেরুয়া শিবির মনে করে, জন্মই যেন সংখ্যালঘু সমাজের আজন্ম পাপ! জন্ম থেকেই ছায়ার গর্ভে বেড়ে ওঠে— প্রশ্নের ছায়া, সন্দেহের ছায়া, আতঙ্কের ছায়া। এমন তো কোনোদিন বাংলার সমাজজীবন ছিল না। বাংলায় তো কোনোদিন ধর্ম পরিচয় জীবনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেনি। তাই গোটা পশ্চিমবঙ্গের উপরেই এখন বিজেপির ভারত ক্রোধান্ধ। ক্ষমতার শিখরে চেপে যখন ঔদ্ধত্য লাগামাছাড়া হয়, তখন ক্ষমতাবান নেতারা নিজেদের ‘খোদা’ ভাবা শুরু করে। ‘অবাঙালি’ নিয়ন্ত্রিত বিজেপির ‘বাঙালি বিদ্বেষ’ আমাদের সেই কথাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে!
কে ওদের বোঝাবে, বাঙালি হিন্দু আর বাঙালি মুসলিম এই রাজ্যের বাঙালি সমাজ ও বাংলা ভাষার সমান অংশীদার। এ কোনো জনসংখ্যার শতাংশের হিসাব নয়, এটা অনেক শতকের ইতিহাসের হিসাব। এই ভাবেই বাঙালি সমাজ ও সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘুর অনুপাত বদলালেই ভাষা সংস্কৃতি সমাজের চরিত্র বদলে যায় না। অনেক দিনের পাশাপাশি চলার ফলে তা তৈরি হয়। পরাধীন ভারতে ধর্ম-ধর্ম উন্মাদনার পরও ধর্মের ভিত্তিতে দেশ-ভাগাভাগিটা সম্পূর্ণ করা যায়নি। কারণ, ওই ভাবে মাটির ভিতরে শিকড়ে-শিকড়ে জড়ানো সমাজ-সংস্কৃতি উপড়ে ফেলা অসম্ভব। সেই ইতিহাস আজ ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। শুরু হয়েছে উগ্র অসহিষ্ণুতা, মৌলবাদে ফেরার ডাক। সেই ডাক এখন বঙ্গ বিজেপির মুখে মুখে। বাংলার মানুষ এই বিভাজন মানবে কেন?
গেরুয়া শিবিরের মুখ আর মুখোশের পার্থক্য ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, বাঙালি হিন্দু সমাজের যে অংশটা রামমোহন-বিদ্যাসাগরদের প্রগতিশীলতার চরম বিরোধিতা করে, সেই রক্ষণশীল অংশই বিজেপির অনুপ্রেরণা। বাঙালিরা জানে, এ দেশের হিন্দুত্ববাদীরা এখন রবীন্দ্রনাথের প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনাকে প্রতিহত করার জন্য বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রকৃত সনাতনী রূপে তুলে ধরতে চাইছে। কারণ, রবীন্দ্রনাথের দেশবীক্ষা এঁদের উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। রামমোহন, বিদ্যাসাগর থেকে লালন ফকির, বাংলার উদার প্রগতিশীল ধারার উজ্জ্বল সব ব্যক্তির সংশ্লেষ ঘটেছিল রবীন্দ্রনাথে। যে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘অবিচলিত সনাতন প্রথার বড়াই যদি কেহ করিতে পারে তবে সে পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ, মানুষ নহে,’ তাঁকে হজম করা সনাতনী হিন্দুত্ববাদীদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব? বিজেপি নেতারা জানেনই না, বঙ্কিমচন্দ্রকে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের জনক হিসাবে উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই। দু’জনের জীবন অনুসরণ করলে বোঝা যায়, বঙ্কিম কত ভাবে রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরক, অগ্রপথিক। প্রগতিশীল বাঙালির মননে বঙ্কিমচন্দ্র বনাম রবীন্দ্রনাথ এই তরজা কোনো দিন স্থান পায়নি এবং আগামী দিনেও পাবে না।
বাঙালি আবেগ বিজেপির জন্য বিপজ্জনক। বাঙালি পরিচয়গত একাত্মতা হিন্দুত্ববাদী শক্তির অন্যতম বড়ো বাধা। বাঙালি আবেগ ‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র’ হানে। কারণ, বাঙালি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে আর্য, অনার্য, মুন্ডা, কোল, বৌদ্ধ, ইসলামি ও আরও নানা সংস্কৃতির সংমিশ্রণে। আর বিজেপি তথা সঙ্ঘ পরিবার চায়, বাঙালি তার ভাষা-সাংস্কৃতিক আবেগ ছেড়ে আর্যাবর্ত অর্থাৎ উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বৈদিক হিন্দুত্ববাদী আবেগ আঁকড়ে ধরুক। সঙ্ঘ পরিবার চায়, অন্যান্য সমস্ত পরিচয়কে হিন্দু পরিচয়ের অধীন হতে হবে। তাই বাঙালি আবেগ, যা মূলত উদার ও প্রগতিশীল, তার সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের উগ্র রক্ষণশীলতার সম্পর্ক সম্পূর্ণ বিপরীত।
হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রধান কৌশল, উত্তর ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচার-আচরণ এই রাজ্যে প্রতিষ্ঠা করে বাংলার সংস্কৃতিকে ধ্বংস করা। যদিও অন্য ভাষার মানুষের প্রতি বিদ্বেষ শুধুমাত্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিক থেকে নয়, বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি ও চরিত্রের সঙ্গেও খাপ খায় না। এটা বোঝার ক্ষমতা থাকলে ভোট মরশুমে ভিনরাজ্য থেকে অবাঙালি নেতারা এসে এ রাজ্যে মাতব্বরি করতেন না। তাঁদের ক্ষমতাই নেই বাঙালির মনন ছোঁয়া। বাঙালি-অস্মিতায় একের পর এক আঘাত নামিয়ে বাংলাকে যারা ক্ষত বিক্ষত করতে চায়, তাদের হাত যারা ধরে, তারাও আসলে বাঙালি বিদ্বেষী। বাংলার শত্রু।
মানুষকে মানুষ হিসেবে না দেখে, স্রেফ ভোটব্যাংক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত এ দেশের স্বঘোষিত ধর্ম-ঠিকাদাররা। তাঁরা শেখাতে চান— সাধারণ মানুষের দুঃখকষ্ট, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অব্যবস্থা, কর্মহীনতা, সামাজিক ও আর্থিক শোষণ, এই সব কিছু থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হিন্দু ধর্মকে বিস্তৃত ও প্রতিষ্ঠা করা। প্রতিটি ভোটে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে অভ্যস্ত বাঙালিকে ধর্মের নামে বিভেদে লড়িয়ে দিয়ে তাঁরা সেই মোক্ষলাভের স্বপ্ন দেখান।
সেই ফাঁদে কোনোদিনই পা দেয়নি বাঙালিরা। দেবেও না। তা আবার প্রমাণিত হবে ৪ মে।