


একটা সময় ছিল যখন সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিজ্ঞানী তো দূরে থাক, মেয়েদের চাকরি করাকেই সুনজরে দেখা হতো না। সেই জায়গা থেকে কীভাবে মঙ্গলযান মিশনে জড়িয়ে গেলেন ডঃ ঋতু কারিধাল শ্রীবাস্তব?
স্বপ্ন ছিল আকাশ ছোঁয়ার, কিন্তু আমি পৌঁছলাম তারও উপরে... মহাকাশে।’
লখনউয়ের অলিগলি থেকে সোজা মহাকাশ, চন্দ্রযানের সফল অবতরণ— কল্পনা নয়, ঘোর বাস্তব। যাত্রাপথ সহজ ছিল না, মসৃণও নয়। সম্বল বলতে প্রতিভা আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি। আর সেটাই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের এভারেস্টে। প্রমাণ হয়েছে, কোনও কিছু মনপ্রাণ দিয়ে চাইলে কোনও বাধাই বড় হয়ে দাঁড়াতে পারে না। তিনি ‘ভারতের রকেট উওম্যান’ ডঃ ঋতু কারিধাল শ্রীবাস্তব। মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরোর নিছক একজন বিজ্ঞানীর তকমায় যাঁকে ধরা যায় না। দেশের কোটি কোটি মহিলার কাছে প্রেরণার অপর নাম তিনি। তাঁর গল্প শুধু সাফল্যের নয়, লড়াই-সংগ্রামের, এবং শেষপর্যন্ত স্বপ্নকে জয় করার।
সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ইনার হুইল ক্লাবস ইন ইন্ডিয়া’-র উদ্যোগে ‘অরাম অ্যাফেয়ার— আ লেগ্যাসি এচড ইন গোল্ড’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ঋতু। সেখানেই ভাগ করে নিলেন তাঁর যাত্রাপথের কাহিনি।
‘মেয়েকে এত পড়াশোনা শিখিয়ে কী হবে? বিয়ে হবে না তো!’ ছোট থেকেই ঋতুর বাবা-মাকে শুনতে হয়েছিল এই প্রশ্ন। কিন্তু তাঁরা কখনও ঋতুর হাত ছাড়েননি। সেদিনের ছোট্ট মেয়েটি স্বপ্ন দেখত। আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবত, ‘ওই নক্ষত্রগুলো কি সত্যিই এত দূরে?’ স্কুলে অঙ্ক ও বিজ্ঞানের ক্লাসে ছোট্ট ঋতুর প্রশ্নগুলি চমকে দিত শিক্ষকদের। সময়টা গত শতাব্দীর আটের দশক। সেই সময় তো সাধারণ মধ্যবিত্ত সমাজে ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিজ্ঞানী তো দূরে থাক, মেয়েদের চাকরি করাকেই সুনজরে দেখা হতো না। কিন্তু লখনউয়ের পরিবারটি সেই গড্ডলিকা স্রোতে গা ভাসায়নি। আজও ঋতু মনে করেন, যে কোনও শিশুর, বিশেষ করে মেয়েদের আসল সাপোর্ট সিস্টেম বাবা-মা। তাঁদের অকুণ্ঠ সমর্থন ছাড়া জীবনে এগনো সম্ভব নয়। তাঁর জীবনই এর জ্বলন্ত উদাহরণ। সাফ জানালেন, ‘বিয়ে নয়, আমার বাবা-মা জীবনে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে বুঝতেন অন্য কিছু। পড়াশোনা, কিছু করে দেখানো। তাঁদের জন্যই আমি আজ এখানে।’ বিয়ের পর স্বামী-শ্বশুরবাড়িও তাঁকে নিয়ত সমর্থন করেছেন। ভারতের রকেট উওম্যান মনে করেন, চাকরি-সংসার একা সামলানো যায় না। স্বামী, সন্তান এমনকী তাঁর ভাই-বোন, সকলের সহযোগিতার কারণেই কাজটা অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে।
লখনউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় এমএসসির পর পিএইচডি। পিএইচডির প্রথম ছ’মাসেই গেট উত্তীর্ণ। সুযোগ এল বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে এমটেক করার। পিএইচডি না এমটেক? দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন ঋতু। তখনও মুশকিল আসান হয়ে দাঁড়ান বাবা-মা। মেয়ের উপর তাঁদের আস্থা ও আত্মবিশ্বাস ছিল অটুট। বেঙ্গালুরুর টিকিট কাটতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি ঋতু। এমটেক পড়তে পড়তেই নিয়মিত সংবাদপত্রে ‘কর্মখালি’ বিভাগে দিকে নজর রাখতেন। মূলত ইসরোতে নিয়োগের বিজ্ঞাপনের জন্য। একদিন প্রকাশিত হল কাঙ্ক্ষিত সেই বিজ্ঞাপন। আবেদন করতে দেরি করেননি ঋতু। ১৯৯৭ সালে এমটেক পাশ করলেন। সেবছরই বাড়িতে এল ইসরোর চিঠি। স্বপ্ন দেখার দিন শেষ! এবার স্বপ্নকে সত্যি করার লড়াই শুরু।
ইসরোর বহু প্রজেক্টে কাজের সুযোগ পেয়েছেন ঋতু। তবে গোটা বিশ্ব তাঁকে চিনেছে মঙ্গলযান বা মার্স অর্বিটার মিশনের (এমওএম) ডেপুটি অপারেশনস ডিরেক্টর হিসেবে। ঋতুর কথায়, ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই মিশন। এই প্রথম আমরা অন্তরীক্ষে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ থেকে অনেক দূরে এক গ্রহের দিকে যাত্রা করছিলাম। আক্ষরিক অর্থেই চ্যালেঞ্জিং কাজ। কিন্তু শুধু আমি নই, গোটা টিমে থাকা অনেক মহিলা বিজ্ঞানী মিলে সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছি। প্রথম প্রচেষ্টাতেই মঙ্গল গ্রহে পৌঁছনো, এই সাফল্য একটা রেকর্ড। পরে চন্দ্রযান মিশনেও কাজ করেছি। মঙ্গলযান হোক বা চন্দ্রযান—সব মিশনেই পুরুষদের সঙ্গে কাঁধ কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন মহিলা বিজ্ঞানীরা।’
ঋতুর জীবন শুধু একজন বিজ্ঞানীর সাফল্যের ইতিহাস নয়, প্রত্যেক নারীর জন্য এক অনুপ্রেরণা। তাঁদের জন্য রকেট উওম্যানের বার্তা— ‘যতই মুশকিল সময় আসুক কখনও হাল ছেড়ো না। নিজের উপর বিশ্বাস রাখো। কেউ তোমাকে থামাতে পারবে না। ব্যর্থতাকে ভয় পেলে হবে না। এটাই তোমাকে শক্তিশালী করবে। সবসময় মনে রাখবে— আমরা মেয়েরা শুধু আকাশ নয়, মহাকাশও জয় করতে পারি!’
সৌম্য নিয়োগী