


নয়াদিল্লি: ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’। মোদি সরকারের স্বপ্নের প্রকল্পের হাত ধরে প্রযুক্তির ঢেউয়ে ভেসেছে গোটা দেশ। আর তার সুবাদেই জন্ম নিয়েছে অপরাধের এক কালো অধ্যায়, সাইবার জালিয়াতি! গত কয়েক বছরে যা চারাগাছ থেকে হয়ে উঠেছে মহীরুহ। ফিশিং মেসেজ বা ভুয়ো কিউআর কোড থেকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট—শুধু গত বছরেই এসবের জন্য ভারতবাসী খুইয়েছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা! দিল্লির একটি বেসরকারি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা ডেটালিডসের সাম্প্রতিক রিপোর্ট এমনই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে। চলতি বছরে সেই অঙ্কও ছাপিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় সংস্থা সাইবার ক্রাইম কো-অর্ডিনেশন সেন্টার বা ‘আইফোরসি’। তাদের সতর্কবার্তা, ২০২৫ সালে অনলাইন প্রতারণায় দেশবাসী হারাতে চলেছে ১ লক্ষ ২০ হাজার কোটি টাকা!
ফলে একটা বিষয় স্পষ্ট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠছে সাইবার প্রতারকরা। ফোন করে ওটিপি জেনে টাকা চুরির দিন অতীত। কিউআর কোড জাল, আধার ও প্যান কার্ডের তথ্য হাতিয়ে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সাফ করা পেরিয়ে শুরু হয়েছে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ যুগ। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, কোভিডকালের মতো এক্ষেত্রেও আম জনতাকে সতর্ক করতে প্রচারে নামতে হয়েছে মোদি সরকারকে। যদিও তাতে লাভ কতটা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় যথেষ্ট। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, ২০২২ সালে সাইবার প্রতারকদের হাতে যাওয়া টাকার অঙ্ক ছিল ২ হাজার ৩০৬ কোটি। তা ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ৭ হাজার ৪৬৫ কোটি। সম্প্রতি ‘অনলাইন ফিনান্সিয়াল ফ্রড ও ডিপফেক’ সংক্রান্ত এক রিপোর্টে ডেটালিডসের দাবি, ২০২৪ সালে তা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২২ হাজার ৮৪২ কোটি টাকায় পৌঁছে গিয়েছে। বেড়েছে অভিযোগের সংখ্যাও।
ক্রমবর্ধমান এই অপরাধের নেপথ্যে আঙুল উঠছে ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে। সরকারি সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন মাসে ১ কোটি ৯০ লক্ষ ইউপিআই অ্যাকাউন্ট থেকে ২৪ লক্ষ ৩ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। গত জানুয়ারি মাসে এই অঙ্কটা ছিল ১৮ হাজার ১২০ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা। কোভিড পর্বের পর থেকেই তা লাফিয়ে বেড়েছে। সেই সুবাদে দেশবাসীর আর্থিক লেনদেনের তথ্য চলে এসেছে একাধিক ‘এনক্রিপ্টেড’ অ্যাপের হাতে। তার সঙ্গে বাড়ছে তথ্য চুরির ঘটনা। অনলাইন প্রতারণার আসল চাবিকাঠি যে সেই তথ্যই!
নিত্যনতুন অভিনব সব পদ্ধতিতে চলছে সাইবার প্রতারণা। এর কারণ হিসেবে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর এক তথ্য, বাড়তে থাকা বেকারত্বের জ্বালা! হিসেব বলছে, এই মুহূর্তে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৯০ লক্ষ। তাঁদেরই একটা বড় অংশ সহজ আয়ের লোভে নাম লেখাচ্ছে এই সাইবার প্রতারকদের দলে। শিক্ষিত হওয়ার কারণে এই সমস্ত অপরাধীদের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। আর তাদের ভাঁড়ারের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্রের নাম, ডিপফেক। এই অস্ত্র দিয়ে নিশানা করা হচ্ছে ব্যাঙ্ক, বিমা, স্বাস্থ্য, ব্যবসাক্ষেত্রকে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষের (২০২৫-২৬) প্রথম অর্ধে ২১ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক জালিয়াতি হয়েছে। গত বছর এই একই সময়ে প্রতারণার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। এর পরেই রয়েছে অ্যাপনির্ভর বিমা সংক্রান্ত জালিয়াতি।
আই৪সি’র তথ্য অনুযায়ী, প্রতারণার জন্য জালিয়াতদের সবচেয়ে পছন্দের প্ল্যাটফর্ম হোয়াটসঅ্যাপ। ২০২৪ সালে প্রথম তিন মাসে শুধু এই অ্যাপেই ৪৪ হাজার আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ জমা পড়েছে। তালিকায় রয়েছে টেলিগ্রাম, ইনস্টাগ্রাম, ফেসবুক এবং ইউটিউবও। সাইবার প্রতারণায় সচেতনতা প্রসারের পাশাপাশি কঠোর আইন পাশ করেছে কেন্দ্র। তাতে কতটা রাশ টানা যায়, সেটাই দেখার।