


পি চিদম্বরম: দু’জন ব্যক্তি নাচের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এই উপলক্ষ্যে কানে আসছে সংগীতের মৃদু ধ্বনি। গায়ক অদৃশ্য এবং আবহ থেকে এটা স্পষ্ট যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী সেই গায়ক নন।
নরেন্দ্র মোদি অনেক দূর এগিয়ে এসেছেন—মহাবলীপুরম থেকে, যেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট জি জিন পিংয়ের সঙ্গে ‘দোলে দোদুল দোলে ঝুলনা’র মধুর অনুভূতি ভাগ করে নিয়েছিলেন, ২০২০ সালের ১৫ জুন গলওয়ানে লাল ফৌজ (পিএলএ) ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ, ২০ জন ভারতীয় জওয়ান শহিদ হওয়ার বিষাদ এবং ১৯ জুন সর্বদলীয় সভায় নরেন্দ্র মোদির স্মরণীয় ক্লিন-চিট, ‘‘কোনও বহিরাগত লোকজন ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করেনি এবং কোনও বহিরাগত মানুষ ভারতীয় ভূখণ্ডে নেই।’’
প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতায় মন্ত্রীরা
সপ্তাহ কয়েকের ভিতরেই প্রধানমন্ত্রীর বিরোধিতা করলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং বিদেশমন্ত্রী! তাঁরা ‘রেড লাইন’ নির্ধারণ করে দিলেন—স্থিতাবস্থা পরিবর্তনের যেকোনও একতরফা প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যানযোগ্য, এবং ‘সীমান্তে শান্তি’ ও পূর্বের স্থিতাবস্থা পুনরুদ্ধার করাই হল চীনের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্কের পূর্বশর্ত। কমান্ডার পর্যায়ের আলোচনায় ভারত তিনটি পদক্ষেপের প্রক্রিয়ার প্রস্তাব করে: সেনা সমাবেশ না করা, উত্তেজনা প্রশমন এবং সেনাবাহিনীর রণমূর্তি পরিত্যাগ। ভারতকে আলোচনায় টেনে এনে এবং ভারতের সেনা সমাবেশ কমিয়ে, চীন কিন্তু উত্তেজনা প্রশমন এবং তাদের সেনাবাহিনীর রণমূর্তি পরিত্যাগের নীতি উপেক্ষা করেছিল। স্যাটেলাইট চিত্রসহ সমস্ত প্রমাণ বিপরীত সাক্ষ্য দিয়েছিল যে—চীন সরকার সীমান্তে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করেছিল। তাদের তরফে একইসঙ্গে সাজানো হয়েছিল বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম। স্থাপন করা হয়েছিল ফাইভ জি নেটওয়ার্ক। নির্মাণ করা হয়েছিল এয়ারস্ট্রিপ এবং নতুন পাকা রাস্তা। সৈন্য এবং সাধারণ মানুষের জন্য নতুন বসতিও স্থাপন করা হয়েছিল ওই অঞ্চলে। চীন অবশ্যই স্টেটাসকো বা স্থিতাবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।
গলওয়ানই একমাত্র সংঘাতের জায়গা নয়—ডেপসাং এবং ডেমচোক সমস্যারও সমাধান কিন্তু হয়নি। ‘দ্য হিন্দু’র মতে, এই পয়েন্টগুলিতে চীনা সামরিক বাহিনী প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় (এলএসি) ভারতের দিকেই রয়েছে। সাম্প্রতিককালেই, গত ডিসেম্বরে ভারতের বিদেশমন্ত্রী বলেছিলেন যে, ‘‘২০২০ সাল থেকে আমাদের সম্পর্ক স্বাভাবিক নয়।’’
সবচেয়ে খারাপ আঘাতটি এসেছিল চলতি বছরের জুন মাসে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চারদিনের যুদ্ধের সময়। চীনা বিমান (জে-১০) এবং ক্ষেপণাস্ত্র (পিএল-১৫) পাকিস্তানে মোতায়েনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল জিনপিংয়ের দেশের থেকে। এই প্রমাণও মিলেছে যে, যুদ্ধে কৌশল গ্রহণে লাল ফৌজ বা পিএলএ’ই পাকিস্তানকে সাহায্য করেছিল এবং যুদ্ধ পরিচালনায় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিল তারা।
আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ
ভারত সরকার চীন থেকে ‘বিচ্ছিন্ন’ হওয়ার কথা বলেছিল, কিন্তু এটি কঠিন বলেই প্রমাণিত হচ্ছে। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি বছরের পর বছর বেড়ে চলেছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে সেই ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছে গিয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের জন্য ভারত প্রায় সম্পূর্ণরূপে চীনের উপর নির্ভরশীল। ১৭৪টি চীনা কোম্পানি ভারতে রেজিস্ট্রেশনসহ ব্যবসা করছে। ৩,৫৬০টি ভারতীয় কোম্পানির বোর্ডে রয়েছেন চীনা ডিরেক্টর (সূত্র: লোকসভায় প্রশ্নোত্তর, ১২.১২.২২)।
ভারত-চীন যুদ্ধের পর, টিকটক-এর মতো দুই শতাধিক চীনা মোবাইল অ্যাপ ভারত নিষিদ্ধ করেছিল। চীনা বিনিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল (ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত ভাগাভাগিকারী দেশ হিসেবে) এবং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল এদেশে চীনা কোম্পানিগুলির লগ্নি। উত্থাপন করা হয়েছিল ‘নো-ট্যারিফ ব্যারিয়ারস’। দিল্লি-মিরাট রিজিওনাল র্যাপিড ট্রানজিটে (আরআরটিএস) চীনের অংশগ্রহণ এবং সড়ক ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো নির্মাণ ক্ষেত্রের কিছু টেন্ডার বাতিল করা হয়। পাল্টা হিসেবে চীনও তাদের পক্ষ থেকে ক্রিটিক্যাল মিনারেল এবং সার রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে সৌরবিদ্যুৎ, বিদ্যুৎচালিত গাড়ি এবং অন্যান্য শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ‘ইন্টারমিডিয়েট গুডস’ সরবরাহও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
মিস্টার জি সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনে (এসসিও) বিপুল ‘রাজনৈতিক পুঁজি’ বিনিয়োগ করেছেন। অতীতের এসসিও শীর্ষ সম্মেলনগুলিতে (২০১৯, ২০২২ ও ২০২৪) নরেন্দ্র মোদি এবং মিস্টার জি’র মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়নি। সেদিক থেকে তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত ২০২৫ সালের শীর্ষ সম্মেলনে যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আমরা দেখলাম তা নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। সীমান্ত সংঘাতের বিষয়ে আগামী দিনে কোনোরকম অগ্রগতির সম্ভাবনা কম। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলিতে উভয় পক্ষের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ে যে পার্থক্য ক্রমবর্ধমান তার অগ্রগতি অবশ্য হতে পারে। যদি তেমনটা ঘটে তবে ভারত ও চীন উভয়ের জন্যই ইউটার্ন নেওয়ার মতোই একটি ব্যাপার হবে।
সম্পর্কে ইতি
কেন দুই দেশই নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়াতে আগ্রহী হল তা অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে হরিহর আত্মা দোস্তি পাতিয়েছিলেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করতেই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিক্ত শিক্ষা হয়েছে ভারতের।
ভারত এমন একজন ‘ট্রানজাকশনাল প্রেসিডেন্টের’ কাছ থেকে এই নির্মম শিক্ষা পেয়েছে যাঁর ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থ প্রাধান্য পেয়েছে সুষ্ঠু অর্থনীতিকে ছাপিয়ে। আর এই বেনিয়া প্রেসিডেন্টই ভারতের (এবং ব্রাজিল) উপর সর্বোচ্চ শুল্কভার চাপিয়ে দিয়েছেন।
একজন প্রত্যাখ্যাত প্রেমিকের মতোই সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে ভারত, এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের মাধ্যমে স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পেতে চায় এই রাষ্ট্র। একইভাবে, বিশ্বের বৃহত্তম বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাজারের ফায়দা নিতে চায় চীন। নিঃসন্দেহে এই দেশের নাম ভারত। তারা এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে তার প্রভাবের ক্ষেত্র প্রসারিত করতে চায়, তাই একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বীকে মজাবার জন্য কিছু তো করবেই চীন। কিন্তু বাস্তবতা এটাই যে, ভারত-চীন সীমান্তে তার দাবি এবং পাকিস্তানের সঙ্গে সৌহার্দ্যের নীতি থেকে চীন কখনোই সরবে না। মনে রাখতে হবে, পাকিস্তান হল চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশীদার এবং তাদের সামরিক সরঞ্জামের এক বিরাট ক্রেতা। তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে নরেন্দ্র মোদি দুটি বিষয়ের উপর জোর দিয়েছিলেন—ট্রেড অ্যান্ড টেররিজম, অর্থাৎ বাণিজ্য এবং সন্ত্রাসবাদ। মনে রাখতে হবে, জি জিনপিং কিন্তু বিশেষ চাতুর্যের সঙ্গেই ইস্যু দুটি এড়িয়ে গিয়েছেন।
বর্তমানে, রাশিয়া একাই নিরাপদ জায়গায় আছে বলে মনে হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন ভারত, চীন আর ইউরোপে তেল ও গ্যাস এবং ভারতে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রয় অব্যাহত রাখতে পারেন। উত্তর কোরিয়ার সৈন্যদের সাহায্যে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধও চালিয়ে যেতে পারেন পুতিন।
এটা স্পষ্ট যে নরেন্দ্র মোদি কোনও ক্ষেত্রেই নির্ণায়ক শক্তি নন। ভারতের বৃহত্তম রপ্তানি গন্তব্য (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) এবং আমদানির সর্ববৃহৎ উৎসের (চীন) মধ্যে আটকা পড়েছেন তিনি। শুল্ক-হুমকি এবং বাণিজ্য-নির্ভরতার মধ্যে আটকা পড়েছেন মোদিজি। তিনি আরও আটকা পড়েছেন কোয়াড এবং এসসিও/আরআইসি’র মধ্যে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো, নরেন্দ্র মোদিও বিশ্বাস করেন যে, তাঁর রাজনৈতিক আচরণ সর্বদা অভ্রান্ত। এমনই, তাঁর ব্যক্তিগত কূটনীতির ধরন। এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা নিয়ে তাঁর উচিত—দোস্তি ডিপ্লোম্যাসি, আলিঙ্গন এবং হাত ধরাধরি করে হাঁটার অভ্যাস পরিত্যাগ করা। বিদেশ-সম্পর্কের জন্য ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিকদের পরামর্শ মেনে চলাই হোক তাঁর আগামী দিনের পথ।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী।
মতামত ব্যক্তিগত