Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

দুর্নীতির পাঁকে...

এগারো বছরের মোদি জমানায় সবচেয়ে বড়ো ‘সাফল্য’ কী? উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের কেষ্টবিষ্টুরা নানা দাবি করতেই পারেন।

দুর্নীতির পাঁকে...
  • ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

এগারো বছরের মোদি জমানায় সবচেয়ে বড়ো ‘সাফল্য’ কী? উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের কেষ্টবিষ্টুরা নানা দাবি করতেই পারেন। কিন্তু দুর্নীতিতে এই সরকার যে রকম ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছে, তার তুলনা মেলা ভার! এসব কোনো বিরোধী দলের অভিযোগ নয়। বরং প্রতিবছর দুর্নীতির এই আকাশচুম্বী ‘সাফল্য’-র জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করে নিতে পারে মোদি সরকার! নিন্দুকেরা বলছে, এই আনন্দে বছরের কোনো একটা দিন ‘দুর্নীতি দিবস’ হিসাবে পালন করার কথাও ভেবে দেখতে পারেন প্রধানমন্ত্রী। তাহলে অন্তত আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সরকারি সিলমোহর পড়তে পারে। শতকরা ৩১ শতাংশ ভারতবাসীর ভোট পেয়ে ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর কুর্সিতে বসার আগে থেকেই নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর লড়াই দুর্নীতির বিরুদ্ধে। নিজেকে তিনি ‘দেশের চৌকিদার’ হিসেবে প্রমাণ করতে চান। ‘খাব না, খেতেও দেব না’— এই ছিল তাঁর মন্ত্র। তারপর এই একই শপথবাক্য তোতাপাখির মতো আউড়ে যাচ্ছেন গত এগারো বছর ধরে। অথচ রাফাল যুদ্ধবিমান কেনা, বিপুল ঋণখেলাপ করে নীরব মোদিদের মতো ব্যক্তিদের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া, একটি বিশেষ শিল্পগোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া, পিএম কেয়ার্স তহবিল, নির্বাচনি বন্ড তহবিল— সিএজি রিপোর্টে অন্তত আটটি ক্ষেত্রে অনিয়ম-সহ একাধিক দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ হয়েছে মোদির সরকার ও দল। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাঁর জেহাদ সর্বজনবিদিত, তিনি কেন দুর্নীতিগ্রস্ত সেই নেতাদেরই কাছে টেনে নেন! অভিযোগ সেখানেই। অথচ দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর হুংকার শোনা গিয়েছে বারবার। যেমন পশ্চিমবঙ্গের এক দাপুটে বিজেপি নেতা। বিরোধীদের মতে, এ এক আজব ‘ওয়াশিং মেশিন’— বিজেপিতে যোগ দিলেই দুর্নীতির যাবতীয় অভিযোগ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়! 

Advertisement

দুর্নীতির এমন ঢালাও কারবারেই বোধ হয় স্বীকৃতি মিলেছে। বিভিন্ন দেশের দুর্নীতির চেহারাটা বেআব্রু করে দিতে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। গত বছর বিভিন্ন দেশ কতটা দুর্নীতির পাঁকে নিমজ্জিত ছিল, তারই একটি র‌্যাঙ্কিং করেছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জার্মানির সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল। ধরা হয়, দুর্নীতির মাপার সূচক শূন্য থেকে একশো পর্যন্ত। অর্থাৎ যার নম্বর যত বেশি, সে তত কম দুর্নীতিগ্রস্ত। অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা বা অস্বচ্ছতা নিয়ে বিভিন্ন সূচকের নিরিখে এই রিপোর্ট তৈরি করা হয়। এ জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয় বিশ্বব্যাংক, আফ্রিকান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, আইএমডি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট সংস্থার মতো বিশ্বের প্রথম সারির সংস্থাগুলির থেকে। ফলে কোনো দেশের সরকারের তথ্য ফাঁকি দেওয়া বা গোপন করার সুযোগ কার্যত নেই। 
১৮২টি দেশকে নিয়ে তৈরি এই তালিকায় ১০০-র মধ্যে ৮৯ নম্বর পেয়ে শীর্ষস্থানে রয়েছে ডেনমার্ক। ফিনল্যান্ড ৮৮ নম্বর পেয়ে দ্বিতীয় এবং সিঙ্গাপুর ৮৪ নম্বর পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। তালিকায় একেবারে শেষের তিনটি স্থান দখল করে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তকমা পেয়েছে দক্ষিণ সুদান, সোমালিয়া ও ভেনেজুয়েলা। এই তালিকায় বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ আমেরিকা রয়েছে ২৯তম স্থানে। ব্রিটেন ২০তম স্থানে। আরেক শক্তিধর রাষ্ট্র, ভারতের প্রতিবেশী চীন ৪৩ নম্বর পেয়ে দখল করেছে ৭৬তম স্থান। মোদিকে খুশি করে রিপোর্ট বলছে, ভারতের আরও দুই প্রতিবেশী পাকিস্তান ও বাংলাদেশ রয়েছে তালিকার ১৩৬তম (২৮ নম্বর পেয়ে) ও ১৫০তম (২৪ নম্বর পেয়ে) স্থানে। আর ভারত? ২০২২-এ ভারতের র‌্যাঙ্কিং ছিল ৮৫। ২০২৩-এ তা বেড়ে হয় ৯৩। ২০২৪-এ এ দেশের র‌্যাঙ্কিং ছিল ৯৬-তে। ২০২৫-এ তা নেমে ভারত রয়েছে ৯১তম স্থানে। ২০২৫-এ নম্বর পেয়েছে ১০০ তে ৩৯। এই রিপোর্টে পরিষ্কার, দুর্নীতির প্রশ্নে ভারতের ধারাবাহিকতা অব্যাহত। নম্বর কিংবা র‌্যাঙ্কিং— কোনো ক্ষেত্রেই বিশেষ হেরফের নেই। অথচ দুর্নীতির বিরুদ্ধে নরেন্দ্র মোদি নাকি জিরো টলারেন্স! তিনি যেভাবে প্রচারে গলা চড়ান, তাতে অর্থনীতিতে না হলেও এক্ষেত্রে আমেরিকা, নিদেনপক্ষে চীনকে ছুঁয়ে ফেলা উচিত ছিল ভারতের। ঘটনা হল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধারাবাহিক লড়াই ও কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বের ৩১টি দেশ কিন্তু উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্নীতি কমাতে সফল হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি অবশ্য এসব দেখতে পান না! তিনি বোধহয় পিছনের দরজা দিয়ে দুর্নীতি ঢুকিয়ে সামনের দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে আসল সত্য চাপা দিতে চাইছেন। শাক দিয়ে কি জ্যান্ত মাছ ঢাকা যায়!

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ