সংবাদদাতা, বহরমপুর: তালপাতার উপর মোষের রক্ত দিয়ে হাতে লেখা পুঁথি ধরেই বহরমপুরের খাগড়া ভট্টাচার্য পরিবারের দুর্গাপুজো হতো। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত দুর্গাপুজোয় এই হাতে লেখা পুঁথির স্ত্রোত্রপাঠ করে পুজো করতেন পরিবারের সদস্য। ১৯৮০ সালের পর থেকে ওই পুঁথি পড়ে আর পুজো হয় না। কারণ ওই পুঁথি পরিবারের লোকজন সযত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। এখন অন্য পুরোহিত ভট্টাচার্য পরিবারের পুজো করেন।
ভট্টাচার্য পরিবারের ২০০ বছরের প্রাচীন পুজোয় বলিদান প্রথা অনেক আগেই তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন নবমীতে ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। প্রতিপদ থেকে চলে চণ্ডীপাঠ। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত এক হেঁসেলে রান্না হয়। পারিবারিক পুজো বর্তমানে ‹তপস্যী রামকৃষ্ণ স্মৃতিরক্ষা কমিটির(ট্রাস্ট) নামেই হয়ে আসছে। ট্রাস্টের সম্পাদক অঞ্জন ভট্টাচার্য বলেন, রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সংসার ত্যাগ করে সাধক বামাক্ষাপার সঙ্গে বিন্ধপর্বতে তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন। স্বপ্নাদেশ পেয়ে বাড়ি ফিরে সংসারি হন। পুঁথিটি রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের নিজের হাতে লেখা।
ভট্টাচার্য পরিবারের পুজো শুরু হয় তাঁদের আদি বাড়ি নবগ্রাম থানার অমৃতকুণ্ডে। ১৩০ বছর আগে বহরমপুরে খাগড়া এলাকায় উঠে আসে পরিবার। তখন থেকেই পরিবারের নিজস্ব মন্দিরে পুজো হয়। দুর্গা মন্দিরের পাশে কালীমন্দিরে পঞ্চমুণ্ডির আসনে পুজো হয় রটন্তী কালীর। তপস্যী রামকৃষ্ণ স্মৃতি রক্ষা কমিটির সভাপতি শান্তিময় ভট্টাচার্য বলেন, ষষ্ঠীর ঘট এবং সপ্তমী নবপত্রিকার আবাহন পরিবারের লোকেই করে আসছে। পুজো অন্য পুরোহিত করেন। প্রতিপদ থেকে নাটমন্দিরে হয় চণ্ডীপাঠ। পুজোর আচার আচরণ রীতির বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি।
ভট্টাচার্য পরিবারের একচালার প্রতিমার শাক্তমতে পুজো হয়। আগে মোষ বলি হতো। মোষ বলির পরিবর্তে পরবর্তীকালে ছাগ বলি চালু হয়। এখন পরিবার বলিদান প্রথার বিরুদ্ধে। প্রতিদিন দেবীকে পঞ্চ ব্যঞ্জন, সাত ভাজা, পরমান্ন দিয়ে ভোগ নিবেদন করা হয়। নবমীতে দেবীর ভোগের পাতে থাকে গঙ্গা ও পদ্মার ইলিশ মাছের ঝোল। পুজোর উপাচারের আয়োজন করেন পরিবারের গৃহবধূরা। পরিবারের বহু সদস্য রাজ্য ও রাজ্যের বাইরে থাকেন। তবে পুজো চারদিন পরিবারের সমস্ত সদস্য একত্রিত হন। দশমীর দিন সিঁদুর খেলা হয়। আর বিসর্জনের পর বসে পারিবারিক জলসার আসর। জলসার নিয়ন্ত্রণ থাকে পরিবারের মহিলা ব্রিগেডের হাতে।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য অলোকমোহন ভট্টাচার্য উপদেষ্টা মণ্ডলীর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, এই পরিবারের দুর্গাপুজোর কৌলিন্য আজও একইভাবে অম্লান রয়েছে। রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্যে হাতে লেখা পুঁথি এই পরিবারের গরিমা।