Bartaman Logo
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

স্বামী হত্যার অভিযোগে জেলবন্দি বধূ, তিন বছর পর ফুটফুটে মেয়ের মুখ দেখবে বন্দি মা

সংসারে নিত্য অশান্তি। একদিন রাগের চোটে স্বামীকে খুনই করে বসল স্ত্রী! দম্পতির কোলে তখন চার বছরের কন্যাসন্তান টিয়া (নাম অপরিবর্তিত)। সে তখনও দুগ্ধপোষ্য।

স্বামী হত্যার অভিযোগে জেলবন্দি বধূ, তিন বছর পর ফুটফুটে মেয়ের মুখ দেখবে বন্দি মা
  • ১৬ মে, ২০২৫ ০৪:০০
Prefer us on Google

সুমন তেওয়ারি, আসানসোল: সংসারে নিত্য অশান্তি। একদিন রাগের চোটে স্বামীকে খুনই করে বসল স্ত্রী! দম্পতির কোলে তখন চার বছরের কন্যাসন্তান টিয়া (নাম অপরিবর্তিত)। সে তখনও দুগ্ধপোষ্য। মা’কে ছাড়া তার এক মুহূর্ত চলে না। চলার কথাও নয়। খুন, পুলিস, গ্রেপ্তার জেল—কথাগুলির মানে কি, তা বোঝারও বয়স হয়নি টিয়ার। হওয়ার কথাও নয়। সেদিন সে শুধু দেখেছিল, বাবা নেই। মা’কে পুলিসকাকুরা ধরে নিয়ে যাচ্ছে। দাদু-ঠাকুমার গলা জড়িয়ে বায়না ধরেছিল, মায়ের কাছে যাবে। তাঁরা গায়ে হাত বুলিয়ে, কান্না থামিয়ে বলেছিলেন, তোমার মা কিছু দিনের জন্য বাইরে যাচ্ছে। ঠিক ফিরে আসবে। 

Advertisement

ফিরে আসা বললে কি আর ফিরে আসা যায়? স্বামীকে খুনের মতো গুরুতর অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। নিমেষেই একাকি হয়ে পড়ে টিয়া। মা জেলবন্দি। আসানসোল সংশোধনাগারে তিন বছর পেরিয়ে গিয়েছে তার বন্দিদশা। টিয়ার বয়স এখন সাত। দাদু-ঠাকুমা সহ বাড়ির লোকেরা মায়ের সঙ্গে তার দেখা করতে দেননি। এমনকী, ফোনেও কথা বলাতে চাননি। এদিকে, মা ব্যাকুল। যতই হোক মায়ের মন তো! মেয়ের মুখটা দেখতে খুব ইচ্ছে করে। একটু আদর করতে মন চায়। সপ্তাহে একদিন অন্যান্য বন্দির পরিবারের লোকেরা জেলে আসেন। সবার সঙ্গে দেখা করেন। কথা বলেন। টিয়া আর আসে না। মেয়ের পথ চেয়ে মায়ের চোখের জল শুকিয়ে যায়। অবশেষ আজ, শুক্রবার মা-মায়ের পুনর্মিলন। সৌজন্যে আসানসোল জেল কর্তৃপক্ষ। 
আসানসোল জেলা সংশোধনাগারে আয়োজিত হবে বন্দি ও পরিবারের মধ্যে এই পুনর্মিলন উৎসব। সাক্ষী থাকবেন জেলা প্রশাসন ও পুলিসের শীর্ষকর্তা থেকে বিচারকরাও। সবমিলিয়ে চারজন বন্দি দীর্ঘকাল পর তাদের পরিবারের সঙ্গে মিলিত হবে। নিজেদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়কে খুনের অভিযোগে এতদিন তারা পরিবার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। কেউই যোগাযোগ করত না। স্বভাবতই মিলন উৎসবকে সামনে রেখে উৎফুল্ল চারজনই। উৎসবে থাকছে একাধিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বন্দিরা ইংরেজিতে কবিগুরুর লেখা গীতাঞ্জলি পাঠ করবে। একজন বন্দি স্বরচিত কবিতাও পড়ে শোনাবে। মঞ্চস্থ হবে নাটক। বন্দিদের সঙ্গে অভিনয় করবেন সংশোধনাগারের সুপারিনটেন্ডেন্ট থেকে কন্ট্রোলাররা। উদ্বোধন হবে একটি দেওয়াল পত্রিকারও। সেখানে ঠাঁই পাবে বন্দিদের ছবি, স্বরচিত কবিতা, দূষণ নিয়ে লেখা। 
সুপারিনটেন্ডেন্ট চান্দ্রেয়ী হাইত বৃহস্পতিবার বলেন, ‘আমাদের সংশোধনাগারে গড়ে চারশো জন বন্দি থাকে। সবারই আত্মীয় পরিজনরা দেখা করতে আসতেন। ফোনেও কথা বলতেন। এই চারজন সম্পূর্ণ একা হয়ে গিয়েছিল। মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিল। ওদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ।’ 
বৃহস্পতিবার ছিল আন্তর্জাতিক পরিবার দিবস। এই দিনটিকে সামনে রেখেই ওই চার বন্দিকে পরিবারের সঙ্গে মেলানোর সিদ্ধান্ত নেয় বিচার ও কারা বিভাগ। এরপর জেলা প্রশাসন এগিয়ে আসে। বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে পৃথক পৃথক ভাবে কথা বলা হয়। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর পরিবারের ‘খুনি’ সদস্যর মুখ দেখতে রাজি হয় পরিবারের বাকি সদস্যরা। টিয়াও জেনেছে সে মায়ের দেখা পাবে। তিন বছর পর মাকে কী বলবে টিয়া, সেদিকেই তাকিয়ে ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজকরা। 
জেলা আইনী পরিষেবা কর্তৃপক্ষের সচিব তথা বিচারক আম্রপালি চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের বিচার প্রক্রিয়ার মূল লক্ষ্য হল সংশোধন করা। সংশোধনকালে কাউকে পরিত্যাগ করাও তো কাম্য নয়। আমরা চাই সবাই যেন নিজের পরিবার ফিরে পায়।’-নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ