নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: খড়দহের রহড়ার আবাসন থেকে অস্ত্রভাণ্ডার উদ্ধারের ঘটনায় নয়া মোড়। কলকাতার এক শতাব্দীপ্রাচীন অস্ত্রবিপণির তিন কর্তাকে শুক্রবার গ্রেপ্তার করল বেঙ্গল এসটিএফ। ওই অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিবাদী বাগের দোকানে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই তল্লাশি শুরু করেছিলেন এসটিএফের তদন্তকারীরা। সেখান থেকে ডিবিবিএল (দোনলা) ও এসবিবিএল (একনলা) মিলিয়ে মোট ৪১টি বন্দুক উদ্ধার করেন তাঁরা। কিন্তু এই বন্দুকগুলির কোনও নথি ব্যবসায়ীদের কাছে ছিল না। আরও বেশ কিছু আগ্নেয়াস্ত্র ও কার্তুজের হদিশ মিলেছে। সেগুলির নথি যাচাই চলছে। ইতিমধ্যেই ওই বিপণি সিল করে দেওয়া হয়েছে। এসটিএফ সূত্রে খবর, ধৃত তিন অস্ত্র ব্যবসায়ী হলেন অভীর দাঁ, সুবীর দাঁ ও সুব্রত দাঁ। শুক্রবার বারাকপুর মহকুমা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁদের সাতদিনের জন্য এসটিএফ হেফাজতে পাঠিয়েছেন। লাইসেন্সড দোকান থেকে বন্দুক ও গুলি বেআইনিভাবে খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে তাঁদের বিরুদ্ধে।
গত ৪ আগস্ট রহড়ার রিজেন্ট পার্কের একটি ফ্ল্যাট থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও কার্তুজ সহ গ্রেপ্তার করা হয় মধুসূদন মুখোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তিকে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ভাণ্ডারের মতো এমন বেশ কিছু বন্দুক-গুলি ছিল, যার ‘সোর্স’ কলকাতার ওই অস্ত্র বিপণি। জেরায় মধূসূদন স্বীকার করে নেন, লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকের গুলি কিনতে গিয়েই তাঁর সঙ্গে ওই ব্যবসায়ীদের পরিচয় হয়। ঘনিষ্ঠতা বাড়লে তাঁদের কাছে মধুসূদন প্রস্তাব দেন, লাইসেন্সবিহীন বন্দুক পাওয়া গেলে, তিনি তা কিনবেন। তদন্তকারীরা বলছেন, ওই অস্ত্র বিপণির কর্তারা তাতে রাজি হয়ে যান। দরদামও ঠিক হয়ে যায়। এসটিএফ সূত্রে খবর, নাইন ও সেভেন এমএম পিস্তলের প্রতিটি ৭০ থেকে ৮০ হাজার এবং প্রতিটি দোনলা বন্দুকের জন্য খরচ করতে হবে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। এরপর থেকেই অস্ত্র বিপণি থেকে পিস্তল-বন্দুক সংগ্রহ করে এ রাজ্য এবং বিহার-ঝাড়খণ্ডের গ্যাংস্টারদের বিক্রি শুরু করেন মধুসূদন।
কিন্তু লাইসেন্স বিহীন বন্দুক-পিস্তল ওই অস্ত্র বিপণির কর্তারা পেতেন কোথা থেকে? তদন্তে জানা গিয়েছে, এই বিপণির অস্ত্রাগারে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বন্দুকধারীরা নানা সময়ে ভাড়ার বিনিময়ে অস্ত্র জমা রাখতেন। ওই সব লাইসেন্স পরে আর রিনিউ হয়নি বা পুলিসের অনুমতি মেলেনি। এরকম বিস্তর বন্দুক-পিস্তল বছরের পর বছর পড়েছিল বিপণির অস্ত্রাগারে। তদন্তকারীরা বলছেন, এরকম বন্দুক-পিস্তল অস্ত্রাগারে জমা থাকলে নিয়মানুযায়ী, অস্ত্র বিপণির তরফে আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে হয়। বিবাদী বাগ এলাকার ওই অস্ত্র বিপণি তা করেনি। তারা ওই বন্দুকধারীদের বাড়ির ঠিকানায় বকেয়া ভাড়া চেয়ে নোটিস পাঠাত। কিন্তু লাইসেন্সপ্রাপকদের একটা বড় অংশ ঠিকানা পরিবর্তন করায় বা ভিন রাজ্যে চলে যাওয়ায় নোটিসের উত্তর আসত না। তদন্তকারীরা বলছেন, এরপর ওই নোটিসের কপি নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হতেন অস্ত্র ব্যবসায়ীরা। দেখাতেন, বকেয়া ভাড়া এবং জমা রাখা বন্দুকের দাম সমান। তাঁদের আর্থিক ক্ষতি যাতে না হয়, তাই ওই আগ্নেয়াস্ত্র তাঁদের অধিকারে দেওয়া হোক। আদালতের নির্দেশ মেলার পর দাবিদারহীন ওই অস্ত্রই মধুসূদনের মতো কারবারিদের বিক্রি করা হতো।