Bartaman Logo
১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
বর্তমান / রাজ্য

বাহাত্তরেও প্রতিমা প্রাণ পায় কৃষ্ণনগরের গীতা পালের হাতে

কৃষ্ণনগরের পালপাড়ার বৃদ্ধা মৃৎশিল্পী গীতা পাল নিষ্ঠা ও ভালোবাসায় আজও গড়ে চলেছেন দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী সহ দেবদেবীর প্রতিমা।

বাহাত্তরেও প্রতিমা প্রাণ পায় কৃষ্ণনগরের গীতা পালের হাতে
  • ৫ জুন, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

অমিয়কুমার বিশ্বাস, কৃষ্ণনগর: মাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আজকের নয়। সেই কিশোরী বয়সে শুরু হওয়া ভালোবাসা আজও অটুট। বয়স এখন ৭২। জীবনের বহু বসন্ত পেরিয়ে এসেছেন। কিন্তু হাতে নেই বার্ধক্যের ছাপ, চোখে নেই ক্লান্তির রেখা। মাটির তাল, বাঁশের কাঠামো, খড়ের বাঁধন আর রং-তুলির টানে আজও কাটিয়ে দেন দিনের পর দিন। কৃষ্ণনগরের পালপাড়ার বৃদ্ধা মৃৎশিল্পী গীতা পাল একইরকম নিষ্ঠা ও ভালোবাসায় আজও গড়ে চলেছেন দুর্গা, কালী, জগদ্ধাত্রী সহ দেবদেবীর প্রতিমা।

Advertisement

মাত্র ১৪ বছর বয়সে মৃৎশিল্পে হাতেখড়ি তাঁর। তখন তিনি চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। ছোটবেলা থেকেই বাবাকে দিনরাত মাটির কাজ করতে দেখতেন। বাবার হাতের ছোঁয়ায় যখন ধীরে ধীরে একটি কাঠামো প্রাণ পেতে শুরু করত, তখন মুগ্ধ চোখে সেই দৃশ্য দেখতেন ছোট্ট গীতা। একসময় কৌতূহল থেকেই নিজে হাতে মাটি ধরেন। নরম আঙুলে প্রতিমার মুখ, নাক, চোখের গড়ন দিতে দিতে কখন যে মাটির প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্মেছিল, তা নিজেও বুঝতে পারেননি। সেই শুরু। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে নিজেকে একজন দক্ষ মৃৎশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করেছেন অসংখ্য প্রতিমা। একসময় তাঁর হাতে গড়া প্রতিমা শুধু নদীয়া জেলাতেই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত এমনকী রাজ্যের বাইরেও পাড়ি দিয়েছে। তাঁর কাজের সূক্ষ্মতা বরাবরই প্রশংসিত হয়েছে শিল্পপ্রেমী ও পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে। বয়স বাড়লেও কাজের প্রতি নিষ্ঠায় এতটুকু ভাটা পড়েনি। এখনও প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা কর্মশালায় কাটান তিনি।
নিজের দীর্ঘ পথচলার কথা বলতে গিয়ে গীতা পাল জানান, ছোটবেলায় পড়াশোনার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। বাবাকে দেখে মাটির কাজের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। আমাদের আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিল না। তাই ছোট থেকেই এই কাজ শিখে বাবাকে সংসারের কাজে সাহায্য করতে শুরু করি। তখন ভাবিনি, এই মাটির কাজই একদিন আমার জীবনের অবলম্বন হয়ে উঠবে। আজও মাটির সঙ্গেই আমার জীবন জড়িয়ে রয়েছে। মা দুর্গা, মা কালী কিংবা মা জগদ্ধাত্রীর চোখে নিজের হাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার যে অনুভূতি, তার সঙ্গে অন্য কিছুর তুলনা হয় না। তিনি আরও বলেন, এখন বয়স হয়েছে। তাই আগের মতো বেশি কাজ নেওয়া সম্ভব হয় না। অর্ডার আসতে শুরু করেছে, এ ছাড়াও কিছু বারোয়ারি দীর্ঘদিন ধরে আমার থেকেই ঠাকুর নেয়। সেগুলোও করতে হয়। যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে, ততদিন এই কাজ করে যেতে চাই।
তিনি মনে করেন, সরকারি উদ্যোগ এবং যথাযথ সহায়তা পেলে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে এবং নতুন প্রজন্মও এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হবে। স্থানীয় বাসিন্দা পূজা হালদার বলেন, গীতা পালের তৈরি প্রতিমা সত্যিই অসাধারণ। ছোটবেলা থেকে ওঁর কাজ দেখে বড় হয়েছি। কৃষ্ণনগরের বহু বারোয়ারি পুজো কমিটি বছরের পর বছর ওঁর কাছ থেকেই প্রতিমা তৈরি করায়। প্রতিটি প্রতিমার মধ্যে আলাদা শিল্পবোধ ও নিষ্ঠার ছাপ থাকে। উনি কৃষ্ণনগরের গর্ব। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিমা গড়ে চলা এই বৃদ্ধা শিল্পী আজও প্রমাণ করে চলেছেন, সৃষ্টিশীলতার কাজে বয়স বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না।  -নিজস্ব চিত্র

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ