


নিজস্ব প্রতিনিধি, বর্ধমান ও সংবাদদাতা, বনগাঁ: স্ত্রীর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদ, দিল্লির নামী প্রতিষ্ঠানের চাকরি খোয়ানোর মতো ঘটনায় চরম মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার মেমারির হুমায়ুন কবীর। কিন্তু নিজে তা মানতেন না। এমনকী বাড়ির লোকজন তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করায়, বাবা-মা’র উপর প্রচণ্ড রাগ পুষে রেখেছিলেন তিনি। বুধবার ভোরের দিকে মেমারির বাড়িতে কাশিয়ারার বাড়িতে বাবা মোস্তাফিজুর রহমান এবং মা মমতাজ পারভিনকে গলা কেটে খুন করার ঘটনা এবং সন্ধ্যায় বনগাঁর মোতিগঞ্জের এতিমখানায় শিক্ষকের উপর হামলার ঘটনার তদন্তকারীরা বলছেন, হুমায়ুনের মানসিক সমস্যা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে, যেখানে যখন তখন তিনি ‘ভায়োলেন্ট’ হয়ে উঠতেন। গ্রেপ্তারের পর সেই নমুনা পেয়েছে বনগাঁ পুলিসও। তাঁর ‘কল্পিত জগতে’ কেউ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছে মনে করলেই, তাঁকে শত্রু ভেবে আক্রমণ করতেন। আর সেই কারণেই বাড়ির কাজের লোককে বাবা-মা অবহেলা করছেন, গরিব বলে অনীহা দেখাচ্ছেন, অজুহাত খাড়া করে তাঁদের নৃশংসভাবে খুন করেছেন হুমায়ুন। এমনকী তাঁর পরিচয় জানতে চাওয়ায় রেগে গিয়ে বনগাঁর এতিমখানার শিক্ষককে ছুরি দিয়ে আঘাতও করে। তদন্তকারীরা বলছেন, কোনও অনুশোচনা নেই তাঁর। বুধবার রাতে বনগাঁ থানায় পৌঁছে তাঁকে জেরা করেন মেমারি পুলিসের তদন্তকারী দল। তাঁদের সামনে হুমায়ুন বলেন—‘বাবা, প্রতিদিন ভোর চারটের সময় ঘুম থেকে ওঠেন। রাতে জেগে ছিলাম। ভোর সাড়ে তিনটের সময় বাবা-মা’র ঘরে ঢুকি। ঘুমন্ত বাবার গলায় ছুরি চালিয়ে দিই। মা আটকানোর চেষ্টা করেছিল। সেই সময় মা’র গলাতেও ছুরি মারি। রক্ত দেখতে আমার ভালো লাগে।’ খুনের পর মৃতদেহ টেনে হিঁচড়ে বাইরে বের করলেন কেন? ঠান্ডা মাথায় হুমায়ুনের জবাব—‘এই নৃশংসতা যাতে সবাই দেখতে পায়, সে কারণেই মৃতদেহ দুটো বাইরে এনে রাখা হয়। প্রতিবেশীরা বাড়িতে আসে না। তাই ঘরে মৃতদেহ পড়ে থাকলে, কেউ টের পেত না।’ মনোবিদরা বলছেন, মানসিক বিপর্যয়ের এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছেন হুমায়ুন, যেখানে নিজের সমস্ত কুকীর্তিকে ‘ন্যায়সঙ্গত’ বলে মনে করতে শুরু করেছেন।
বনগাঁর মোতিগঞ্জের এতিমখানার শিক্ষক হাসানুজ্জামান মোল্লাকে ছুরি দিয়ে আক্রমণ করার পর স্থানীয় লোকজন হুমায়ুনকে ধরে ফেলে, বেধড়ক মারধর করা হয় তাঁকে। সেই সময়ও তাঁকে বলতে শোনা যায়—‘ঘুষটা না দিয়ে একদিন পুলিসকে মার দেখি! আর জি কর কেসে রেপ করল, ওদেরকে মার দেখি! আমি আমার মা-বাপের গলা কেটে এসেছি, জানিস! আমার মা, বাপ গরিবকে দেখতে পেত না বলে। গরিবকে বলত কাজের লোক। সেই জন্য আমি মেরে এসেছি। আমি আল্লার লোক, জন্নাতে আমার বাড়ি!’ গ্রেপ্তারের পর বুধবার রাতে বনগাঁ থানার লকআপে রাখা হয়েছিল হুমায়ুনকে। লেক আপের সিসি ক্যামেরা সে ভাঙচুর করে। গারদ ধরে ঝাঁকানোর পাশাপাশি তুমুল চিৎকার চেঁচামেচিও করে। এখানেই শেষ নয়, বৃহস্পতিবার সকালে আদালতে নিয়ে যাওয়ার পথে হাত বাঁধা থাকলেও, সঙ্গী পুলিস কর্মীদের লাথি মারে, আক্রমণের চেষ্টা করে হুমায়ুন। তদন্তকারীরা বলছেন, এর আগেও বনগাঁয় এসেছিলেন তিনি। খুনের পর সম্ভবত বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার ছক কষেছিলেন হুমায়ুন। অপরদিকে এতিমখানার শিক্ষকের উপর হামলার ঘটনার পর থানা ভাঙচুরের ঘটনায় যে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, বনগাঁ মহকুমা আদালতের বিচারক এদিন তাদের পাঁচদিনের জন্য পুলিস হেফাজতে পাঠিয়েছেন। হুমায়ূনকেও তিনদিনের জন্য পাঠিয়েছেন পুলিস হেফাজতে।