


হিমাংশু সিংহ: অরুণাচলে বিজেপির এমপি সংখ্যা কত? মাত্র দুই। তার জোরেই কেন্দ্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদে গত একদশক ধরে আসীন কিরেন রিজিজু। তিনি সংসদে সক্রিয় এবং এই সরকারের অন্যতম মুখ। এরই উলটো পিঠে ১২ জন এমপি উপহার দিয়েও অবহেলিত বাংলা। একজনও পূর্ণমন্ত্রী জুটল না। এলেবেলে সান্ত্বনা পুরস্কার দুই রাষ্ট্রমন্ত্রী সুকান্ত আর শান্তনু। সবিনয়ে প্রশ্ন করি, এরাজ্য থেকে নির্বাচিত গেরুয়া এমপিদের শিক্ষাদীক্ষা, যোগ্যতা, সাংগঠনিক ক্ষমতা কি এতই কম যে তাঁদের পূর্ণমন্ত্রী করতে অমিত শাহদের এত অস্বস্তি? বাঙালিদের যাঁরা এই চোখে দেখেন তাঁদের খাল কেটে আনবেন আপনি! তামিলনাড়ু থেকে বিজেপির কোনো নির্বাচিত লোকসভা সদস্যই নেই। মোদিজি যতই দৌড়ে যান অদূর ভবিষ্যতেও সেখানে বিজেপির খাতা খোলার সম্ভাবনা ক্ষীণ। এতৎ-সত্ত্বেও তামিলনাড়ু থেকে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী করেছেন নরেন্দ্র মোদি। রাজ্যসভা সদস্য নির্মলা সীতারামন, টানা ৯ বার বাজেট পেশের বিরল সম্মান তাঁর ঝুলিতে। প্রয়াত অরুণ জেটলির পর তাঁকেই বিগত প্রায় এক দশক অর্থমন্ত্রী পদে রেখে দিয়েছে মোদি সরকার। অসমে বিজেপির জেতা লোকসভা আসন মাত্র ৯, এনডিএর ১১। সেই সুবাদেই ডিব্রুগড় থেকে জয়ী সর্বানন্দ সোনোয়াল কেন্দ্রের বন্দর, জাহাজ ও জলপথ পরিবহণ দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রী। আর বাংলার মতো এত বড়ো রাজ্য থেকে নির্বাচিত সম্মাননীয় শান্তনু ঠাকুর মহাশয় ওই একই দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্র! শান্তনুবাবুর যোগ্যতা নিয়ে, বিরাট জনসমর্থন নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে? এর থেকেই বাংলা সম্পর্কে, বাংলার নেতাদের সম্পর্কে এবং বাংলার বিভিন্ন জনজাতি বিশেষত মতুয়াদের ব্যাপারে বিজেপির দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট বোঝা যায়। বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব গুরুত্বহীন করে রাখতে চায় বাংলা ও বাঙালিকে। এরাজ্য থেকে গত উনিশ সালে ১৮ জন এবং চব্বিশের লোকসভা নির্বাচনে ১২ জনকে জিতিয়েও একজনও ক্যাবিনেট মন্ত্রী জোটেনি। এটা অবহেলা নয়? বঙ্গ বিজেপির কুশীলবরা কী বলেন? এর থেকেই একটা দল ও সরকারের ‘প্রায়োরিটি’ বোঝা যায়। যতই ভোট দিন, বিজেপির খাতায় বাংলা চিরদিন এলেবেলে হয়েই থেকে যাবে। ক্ষীর খাবে উত্তর ও পশ্চিম ভারত। খুদকুঁড়ো জুটবে বাংলার। শেষ কথা বলবে হিন্দি বলয়ের নেতানেত্রীরা।
বাঙালির সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগ্য স্বাধীনতার পর বিগত আট দশকে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রিত্বের আসনটা দূর মরীচিকা হয়েই থেকে গিয়েছে। অথচ স্বাধীনতা সংগ্রামে সবার সামনে ছিল বাঙালির আত্মবলিদান। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর সাহস, বিক্রম ও আপসহীন দেশপ্রেম স্বাধীনতা আনলেও তাঁকে শীর্ষ আসনে বসতে দেননি মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরু। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো চক্রান্ত সেটাই। জ্যোতি বসুকে প্রধানমন্ত্রী হতে দেয়নি তাঁর নির্বোধ পার্টি সিপিএম। প্রণববাবুকে ওই চেয়ারে বসতে দেয়নি গান্ধী পরিবার। সামনে শেষ সুযোগ মমতা। নিজের বসা ডালটাকে কেটে ফেলা বাঙালির চিরদিনের স্বভাব। আত্মঘাতী বাঙালির এই হীন রাজনীতির আবর্তে সেই সুযোগও ফসকে গেলে স্বাধীনতার শতবর্ষে জাতীয় প্রেক্ষাপটে বাংলার হাতে একটা আস্ত পেন্সিল ছাড়া কিছুই থাকবে না। আমাদের আঙুল চুষতে হবে। সংঘের সৌজন্যে সাভারকরই হবেন সবচেয়ে বড়ো স্বাধীনতা সংগ্রামী। সব চলে যাবে গুজরাত, মহারাষ্ট্র আর উত্তরপ্রদেশ সহ ডবল ইঞ্জিনের ঝুলিতে। দক্ষিণ ভারতও পিছিয়ে নেই। বাদ নেই অরুণাচল, অসমও, ব্রাত্য থাকবে শুধুই বাংলা। বাংলার হয়ে গলা ফাটানোর জন্য মমতার বিকল্প সহসা আর আসবে না।
নির্বাচন এলেই আমাদের একটাই চিন্তা, যাদের আনব সেই দলটা কতটা বাংলা ও বাঙালির কাছের, আপনজন। বাঙালির আনন্দ, দুঃখ, সংস্কৃতির শরিক। আমাদের পাশে থেকে পূর্ব ভারতের এই অঙ্গরাজ্যের কথা শেষপর্যন্ত ভাববে কি না। এবারের ভোটে এখানেই সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কারণ, বহিরাগত যে দলটা ভীমরবে বাংলা দখলের কথা বলছে, তার ভিত্তিটাই হিন্দি বলয়ে। ভোট এলেই এই বঙ্গে যাঁর নেতৃত্বে দলটা লড়াইয়ে অবতীর্ণ তিনি গুজরাতি, আগামী দুমাস ডেইলি পাসেঞ্জারি করবেন। তারপর আর টিকিটা খুঁজে পাওয়া যাবে না। এই পর্বে কোনো বঙ্গদেশির সামান্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাটুকুও নেই। দু-নম্বর যে ব্যক্তি গেরুয়া দলের হয়ে এই ভোটযুদ্ধ পরিচালনার দায়িত্বে তিনিও গুজরাতি। দলের বর্তমান সর্বভারতীয় সভাপতি বিহারি। প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি জগৎপ্রকাশ নাড্ডা হিমাচল থেকে রাজ্যসভায় নির্বাচিত। বাংলায় দুঃস্বপ্নেও কোনোদিন গেরুয়া সরকার হলে তা চালিত হবে দিল্লির দীনদয়াল উপাধ্যায় ভবন থেকে কোনো গুজরাতি, বিহারি বা মারাঠির অঙ্গুলিহেলনে। বাংলার গেরুয়া নেতারা ঠুঁটো হয়েই থাকবেন। হাসি পায় যখন মনে পড়ে এই দলটাই মনমোহন সিংয়ের অসম থেকে রাজ্যসভায় জিতে প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে কত তির্যক কথা বলেছে একসময়। এই বাংলা দখলের খেলায় জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন স্বঘোষিত আম্পায়ার! তবে ষোলোআনা পক্ষপাতদুষ্ট। গত নভেম্বর থেকে এসআইআর গুগলিতে তিনি খেলাটাকে জমিয়ে দিতে উদ্যত। কে না জানে কমিশনের বর্তমান প্রধান অমিত শাহের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ, গুজরাতেরই প্রাক্তন মুখ্যসচিব। তাঁর কাঁধেই দায়িত্ব পড়েছে এলবিডব্লু অ্যাপিল উঠলেই আঙুল শূন্যে তুলে রাজ্যের শাসক দলকে বিব্রত করার। কিন্তু ওপথে বিশেষ সুবিধা হবে না। এসআইআর রাজ্যের আম জনতাকে খেপিয়ে দিয়েছে। শুধু বিস্ফোরণের অপেক্ষা।
‘বহিরাগত’ বিজেপিকে হিন্দি বলয়ের দল বললেই বিষয়টাকে গুলিয়ে দিতে মাঝেমধ্যেই পালটা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলা হয় বটে, কিন্তু আজকের গেরুয়া রাজনীতিতে পুরোটাই যে গুজরাত, উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ সহ হিন্দিবলয়ের প্রাধান্য তা বুঝতে কারো বাকি নেই। শ্যামাপ্রসাদবাবু তো কোন ছার, বাজপেয়ি, আদবানি, যোশিজির জমানার গেরুয়া নেতারাও আজকের বিজেপির সঙ্গে সাড়ে চারদশক আগের দলটাকে মেলাতে পারেন না, হতাশায় ডুবে যান। হয়তো বিজেপির উত্থানে দেশ থেকে পরিবারবাদের ছায়া অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে কিন্তু ব্যক্তিবাদ পুরোদমে আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে বসেছে। এটাও গণতন্ত্রের পক্ষে মোটেই কম বিপজ্জনক নয়।
সেই কারণেই একশো দিনের কাজের টাকা নিয়ে বিজেপি-শাসিত ডবল ইঞ্জিন রাজ্য থেকে ভূরি ভূরি অভিযোগ জমা পড়লেও সেখানে টাকা দেওয়া বন্ধ হয় না। সবাই জানে একশো দিনের কাজে শীর্ষ বরাদ্দ যোগীরাজ্যের জন্য নির্দিষ্ট। বিভিন্ন ডবল ইঞ্জিন রাজ্যের প্রায় একশো জেলা থেকে দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে। সম্প্রতি লোকসভায় সরকার পর্যন্ত তা স্বীকার করেছে। কিন্তু শাস্তি পেয়েছে শুধু বাংলার গরিব প্রান্তিক মানুষ। বিগত বাইশ সাল থেকে সারা ভারতে একমাত্র বাংলাতেই একশো দিনের টাকা বন্ধ। আবাসের বরাদ্দও বন্ধ। কেউ বলেন বকেয়া টাকার পরিমাণ দু’লক্ষ কোটি টাকা, কেউ বলেন আড়াই থেকে পৌনে তিন লক্ষ কোটি টাকা। এটা কোনোভাবেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে মোদি সরকারের লড়াই নয়, বাংলা ও বাঙালিকে ভাতে মেরে শিক্ষা দেওয়ার নির্মম মধ্যযুগীয় পন্থা। যদি দুর্নীতি রুখে দেওয়াই উদ্দেশ্য হত, তাহলে একাধিক ডবল ইঞ্জিন রাজ্যেও বরাদ্দ বন্ধ থাকত। এমন বাংলা বিরোধী দলকে ভোট দেওয়া বাঙালির আত্মহননের শামিল নয়? বাঙালি আধপেটা খেলেও মাথা উঁচু করে সসম্মানে হাঁটতে ভালোবাসে। এই বিজেপি বাঙালির অস্মিতা ও আত্মসম্মানের মর্ম বোঝে?
সেই কারণেই কাজে গিয়ে বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাঙালি খুন হন। কী অপরাধ ছিল পুরুলিয়ার গরিব সন্তান সুখেন মাহাতর? কোন অপরাধে পুনেতে কাজ করতে গিয়ে অমন নৃশংসভাবে খুন হতে হল তাঁকে? বাঙালি বলে? বাংলা বলার ‘অপরাধে’! শুধু পুরুলিয়াই-বা বলি কেন, গত একবছরে কোন জেলার পরিযায়ী শ্রমিক নিগৃহীত হননি ভিন রাজ্যে। মুর্শিদাবাদের জুয়েল রানা গিয়েছিলেন ওড়িশায়। বাংলা বলায় তিনি খুন হন। প্রাণহানির সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। ছ’বছর আগে কোভিড লকডাউনের সময় সারা দেশে প্রায় ২০০ পরিযায়ী শ্রমিক প্রাণ হারান। দেশজুড়ে হইচই হলেও কেন্দ্রীয় সরকার হাজার হাজার প্রান্তিক মানুষের কষ্ট লাঘবে তখন কিছুই করে উঠতে পারেননি। গত একবছরে শুধু বাংলা বলার অপরাধে যাঁরা ডবল ইঞ্জিন রাজ্যে মার খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, সেই সংখ্যাটাও সেঞ্চুরির দিকে ছুটছে।
মোট বারোটি রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া চলছে। অসমে চলছে এসআর প্রক্রিয়া। সেখানে ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত তালিকাও বেরিয়ে গিয়েছে। বাদ পড়েছে মাত্র ২ লক্ষ ৪৩ হাজার। অথচ ভোটের আগে তালিকা বিভ্রাটে এখনও ভুগছে বাংলা, কেরল, তামিলনাড়ু। প্রত্যেকটিই বিরোধী-শাসিত রাজ্য। এই রাজ্যগুলিই কমিশনের টার্গেট। কারণ, সেখানে এবারও গেরুয়াঝড়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ। তাই গোলেমালে যদি বিজেপিকে প্রাসঙ্গিক করে তোলা যায় সেই লক্ষ্যেই পূর্ব ভারত থেকে শুরু করে একেবারে দক্ষিণ, বশংবদ নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে ভোটার তালিকাটাকেই গুলিয়ে দিতে মরিয়া কেন্দ্রের শাসক দল। কুড়িটি রাজ্য আপাতত বিজেপির দখলে। কিন্তু খিদে যায় না। এটাও তো একটা সামন্ততান্ত্রিক নেশাই বটে। যেসব প্রদেশ একদা আরএসএসের মানচিত্রের বাইরে ছিল, সেখানেও এই মওকায় ছিপ ফেলে রাঘববোয়াল ধরতে বাধা কোথায়?
নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন, বিজেপি এই বাংলায় চাকরি দেবে না। বিজেপি শিল্পও দেবে না। ‘সুনার’ বাংলাও কথার কথা হয়েই থেকে যাবে। পারলে বাপের পয়সায় স্টার্ট আপ খোলো, এই বর্তমান সরকারের নিদান। সম্প্রতি মোদিজি যখন সিঙ্গুরে এলেন তখন বলা হল, তিনি নাকি একটা শিল্পস্থাপনের ব্লুপ্রিন্ট দেবেন। কিন্তু কিছুই মিলল না। সবই ফাঁকা আওয়াজ। মোদিজি জানেন, ওসব শিল্পটিল্প নিয়ে কথা বাড়িয়ে গোলকধাঁধায় ঢুকে লাভ নেই। বরং বিভাজন নিয়ে থাক। অনুপ্রবেশকারী ধরার নামে চোর-পুলিশ খেল। ওতে লাভ আছে। তাই রোহিঙ্গা, বাংলাদেশি ধরার মিথ্যে নাটক চলে ভোট এলেই। গত ১২ বছরে অনেক খুড়োর কল ঝুলিয়েছেন তিনি। কালো টাকা নিয়ে গত একদশকের নাটকটা দেখেছেন। ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর রাতে মনে হচ্ছিল, পরের দিন সূর্যোদয় থেকে আর দেশে কালো টাকা বলে কিছু থাকবে না। কিন্তু আজও কালো টাকার রমরমা দুর্বার গতিতে চলছে। বরং প্যান ছাড়াই দশ লক্ষ টাকা ব্যাংকে জমা করা যাবে, কুড়ি লক্ষ টাকা পর্যন্ত সম্পত্তি কেনা যাবে। অর্থাৎ খোলা ছুট দিচ্ছে মোদি সরকার। প্রমাণ হচ্ছে, নোট বাতিল ছিল প্রকাণ্ড ধাপ্পা।
আপনি কি এমন একটা দলকে ভোট দেবেন যারা পদে পদে বিভাজন করে আর ধাপ্পা দেয়? শুধু হিন্দু-মুসলিম নয়, এই ভাগাভাগিটা বাঙালি-অবাঙালি, ব্যবসায়ী-মধ্যবিত্ত থেকে গরিব-প্রান্তিক, এমনকি রবীন্দ্রনাথ, বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যেও লাগিয়ে দিতে মরিয়া! এমন দলকে ভোট দিয়ে আপনি শান্তি পাবেন কি? বাঙালির আত্মা কিন্তু মুক্তি পাবে না। আপনাকে বারেবারে প্রশ্ন করবে, কি রে বাংলা বিরোধীদের হাতে রাজ্যটাকে তুলে দিয়ে ঠিক করলি তো?