সমীর সাহা, নবদ্বীপ: প্রেমভূমি নবদ্বীপের জঙ্গলও নাকি নিরাপদ!
সমীর সাহা, নবদ্বীপ: প্রেমভূমি নবদ্বীপের জঙ্গলও নাকি নিরাপদ!
স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে মেনে নিতে না পেরে সেই জঙ্গলেই আশ্রয় নিয়েছেন হাওড়ার বছর বত্রিশের বধু। সঙ্গে সাত বছরে কন্যা। টানা ১৫ দিন নবদ্বীপের প্রাচীন মায়াপুরের শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যে আস্তানা গেড়েছেন তিনি। মুখে শুধু রাধে...রাধে...।
মহিলার জঙ্গল-যাপন বলতে একখানি মাদুর, দুটো ফুটিফাটা বালিশ, ছেঁড়া মলিন কম্বল। মেয়েকে নিয়ে দিব্যি তাঁর কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন। বিষধর সাপের ভয় নেই, বিষাক্ত পোকা মাকড় কিংবা মশার ভয় নেই। মন্দ মানুষের আক্রমণেরও ভয় করেন না তিনি। ভয়ের কথা শুনলে বলেন, ‘ভগবান চেয়েছেন। তাই আমি আজ এখানে। শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের আশ্রয়ে মন্দ লোকেরা আমার কিছু খারাপ করার সাহস পাবে না।’ তবে, তিনি সাহসী হলেও উদ্বিগ্ন স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রাতঃভ্রমণকারীরা। অঘটন ঘটার আশঙ্কা করে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন তাঁরা।
নবদ্বীপ ধাম স্টেশন থেকে টোটোতে ১৫-২০ মিনিটের পথ। শহরের একেবারে উত্তর প্রান্ত। পাশ দিয়ে বইছে ভাগীরথী। পাড়ে বিস্তীর্ণ জঙ্গল এলাকা। তার ভিতরে শচীমাতার ঘাট। ছোট্ট নিমাইকে কোলে নিয়ে শচীমাতার আবক্ষ মূর্তি বসানো। সেখান থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে ঝোপের আড়ালে সংসারের মাদুর পেতেছেন ওই মহিলা। মাথার উপর ছাদ বলতে বড় গাছের ছায়া। খর চৈত্রের দুপুরে মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে তিনি চলে যান মঠ-মন্দিরের দরজায়, দরজায়। ভালোবেসে কেউ কিছু পয়সা দিলে দুপুরের কিংবা রাতের আহার জোটে। কোনওদিন খেতে পান, কোনওদিন পান না। তখন জলই ভরসা। রাতে মা-মেয়ে সেটাই খেয়ে ‘রাধে, রাধে’ বলে ঘুমিয়ে পড়েন। তিনি বলছিলেন, ‘মাঝে মধ্যে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার। ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা। দেখি মেয়েটি অঘোরে ঘুমচ্ছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আবারও আমি রাধে, রাধে বলে ঘুমিয়ে পড়ি। সকাল হয়। দেখি সবকিছু ঠিকঠাক। এমনকী আমার মেয়েটার গায়ে একটা মশাও হুল ফোটায় নি।’
গত ১৫ দিন ধরে এটাই রোজ নামচা ওই মহিলার। প্রতিদিন প্রাতঃভ্রমণকারীরা ঘাটের পথ ধরে হেঁটে যান। মা-মেয়ের জঙ্গল-যাপন দেখে তাঁদের করুণা হয়। মেয়েটার হাতে পাঁউরুটি, বিস্কুট তুলে দেন। তবে তাঁরা চান, দ্রুত প্রশাসনের উদ্যোগে ওদের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হোক। কারণ, জঙ্গলে প্রচুর বিষধর সাপ রয়েছে। বিষাক্ত পোকা মাকড়ও রয়েছে। ঘাটে থাকে খারাপ লোকেদের আনাগোনাও।
কিন্তু কেন এই বিপদ সঙ্কুল জীবন বেছে নেওয়া ? জবাবে কিছু বলতে চাননি ওই মহিলা। পাশ থেকে মেয়েটি বলছিল, ‘আমার নাম পিউ দাস। বাড়ি হাওড়া। বাবা একটা সময় তাঁত বুনতেন। পরে বাবা নতুন মাকে আনে। তারপরই মা আমাকে নিয়ে এখানে চলে আসে। মা বলেছে, এখানে একটা ত্রিপল দিয়ে ঘর করে দেবে। আমি সেখানে পড়তে চাই।’ একদা ভালোবাসার স্বামীর নতুন বিয়ে মেনে নিতে পারেননি ওই মহিলা। সংসার ছেড়ে আশ্রয়ের খোঁজে প্রেমভূমে চলে আসেন তিনি। ভরসা বলতে চৈতন্যের জন্মস্থানের নিরাপত্তা। একটা বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ছিলেন কয়েক মাস। তারপর আর ভাড়া দিতে পারেন নি। ছেড়ে দিতে হয় আশ্রয়টি। তারপর মেয়ের হাত ধরে বসবাস শুরু করেন এই জঙ্গলে।
প্রাতঃভ্রমণকারী স্বপন দেবনাথ বলছিলেন মেয়েটির কথাবার্তা খুব ভালো। প্রতিদিন সকাল বেলায় ওকে কিছু খাবার কিনে দিই। কিন্তু ভয় লাগে ওখানে অনেক বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড় রয়েছে যদি কামড়ায়! স্থানীয় চা বিক্রেতা পরেশ ঘোষ জানান ১৫ দিন ধরে দেখছি ওই জঙ্গলের মধ্যে মা মেয়ে থাকছে। প্রশাসন ওদের একটু আশ্রয়ের ব্যবস্থা করলে ভাল হয়।