


বিশেষ নিবন্ধ, পি চিদম্বরম: ভারতের সাধারণতন্ত্রের ইতিহাসের প্রায় চার দশক ধরে, খুব কম মানুষই ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) দিকে নজর দিয়েছিলেন। ভারতের সংবিধানের পঞ্চদশ অধ্যায়ে (পার্ট ১৫) বর্ণিত বিধানগুলি সম্পর্কেও খুব বেশি মানুষ সচেতন ছিলেন না।
পাঁচ বছর অন্তর লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভাগুলির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হত। দলে দলে মানুষ ভোট দিতে আসতেন, কিন্তু নির্বাচনের আইন, বিধি, আয়োজন, প্রস্তুতি এবং ফলাফল নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানতেন। ভোটার তালিকায় নিজের নাম খুঁজে পেলে যে কেউ ভোট দিতে পারতেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ ভোট দিয়েছেন। আবার হাজার হাজার মানুষ ভোট দেননি। কোনো একটি নির্বাচন কেন্দ্রে যে প্রার্থীই জয়ী হোন না কেন, ভোটারদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তা মেনে নিতেন এবং নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে ফিরে যেতেন।
হিংসাত্মক পদ্ধিত অবলম্বেন কিংবা অন্যের ছদ্মবেশে ভোট দেওয়ার (নাম ভাঁড়িয়ে) দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচনগুলি মূলত নির্বিঘ্নেই অনুষ্ঠিত হত। তবে, এই আপাত শান্ত আবরণের আড়ালে লুকিয়ে ছিল বহু অবিচার। বিপুল সংখ্যক মানুষকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তই করা হত না। ভোটারদের একটি বিশাল অংশকে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত করা হত—বিশেষ করে দলিত, আদিবাসী, যেসব এলাকায় কোনো একটি সম্প্রদায়ের আধিপত্য ছিল সেখানকার পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায়ের মানুষ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। এ নিয়ে হয়তো দু-চারদিন কিছুটা শোরগোল উঠত, কিন্তু সেসব থিতিয়ে যেত শীঘ্রই।
একজন লড়াকু সংস্কারকের আবির্ভাব
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধিত্ব করতেন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ছিলেন একজন বিশিষ্ট আমলা বা সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু সামগ্রিকভাবে তিনি ছিলেন অনেকটা আড়ালে থাকা এবং নীরব এক ব্যক্তিত্ব। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার খুব কম ক্ষেত্রেই কোনো বিতর্কে জড়িয়ে পড়তেন কিংবা আদালতের কাঠগড়া পর্যন্ত পৌঁছতেন। যেসব বিরল ঘটনায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে জনসমক্ষে বা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে দেখা যেত, সেগুলি মূলত ঘটত তখন, যখন কোনো রাজনৈতিক দল ভেঙে যেত এবং তাদের জন্য সংরক্ষিত নির্বাচনি প্রতীক নিয়ে প্রকাশ্যে বিবাদ উপস্থিত হত দলগুলির মধ্যে।
১৯৯০ সালে টি এন সেশন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিযুক্ত হন এবং সংবিধানের পঞ্চদশ অধ্যায়ে যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করেন। তিনি নির্বাচনি আইন, বিধি এবং নির্দেশাবলি কঠোরভাবে মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি সাধারণ মানুষকে নির্বাচন কমিশন এবং এর বিপুল ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন। তিনি সুপ্রিম কোর্টে বিভিন্ন মামলা দায়ের করেন এবং এমন সব রায় বা নির্দেশনামা আদায় করে নেন, যা পরবর্তীতে বাধ্যতামূলক বিধিতে পরিণত হয়। তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিরপেক্ষ। তিনি কাউকে কোনো বিশেষ সুবিধা বা অসুবিধা দেখাতেন না এবং অচিরেই তিনি একজন জননায়ক বা লোকনায়কে পরিণত হন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার পদে তাঁর উত্তরসূরিদের মধ্যে বিশিষ্ট ছিলেন জে এম লিংডো, টি এস কৃষ্ণমূর্তি, প্রয়াত নবীন চাওলা এবং এস ওয়াই কুরেশি। গত একদশক ধরে এই পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে শুরু করেছে এবং বর্তমান সময়ের মুখ্য নির্বাচন কমিশনাররা প্রায়ই বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছেন।
এসআইআর-এর আড়ালে দুরভিসন্ধি
২০২৫-২৬ সালের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়াটি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। সংবিধানের ৩২৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “নির্বাচনসমূহ... প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত হবে; অর্থাৎ, ভারতের যে-কোনো নাগরিক, যাঁর বয়স আঠারো বছরের কম নয়... তিনি উক্তরূপ যে-কোনো নির্বাচনে ভোটার হিসাবে নিবন্ধিত হওয়ার অধিকারী হবেন।” এখানে মূল জোর দেওয়া হয়েছে—প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকার, নাগরিকত্ব এবং ভোটার হিসাবে নিবন্ধিত হওয়ার অধিকারের উপর।
এই শব্দগুলির সরল অর্থ হল, ভোটার তালিকায় দেশের সমগ্র প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত থাকা আবশ্যক—কেবল সেই ব্যক্তি ছাড়া, যিনি ভারতের নাগরিক নন। স্বাভাবিক অবস্থায়, প্রতিটি রাজ্যের হালফিল ভোটার তালিকায় (আপডেটেড ইলেক্টোরাল রোলস) মোট ভোটারের সংখ্যা সেই রাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যার প্রায় সমান হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিয়মানুযায়ী দশবছর অন্তর জনগণনা বা সেন্সাস করা হলে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর সঠিক সংখ্যাটি জানা সম্ভব হত। দুর্ভাগ্যবশত, ভারতে জনগণনা দীর্ঘদিন হয়নি, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১১ সালে। তবে, জনসংখ্যার এস্টিমেট পাওয়ার জন্য বর্তমানে উন্নত পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি বা ‘টুল’ রয়েছে এবং বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ সংস্থা এই পদ্ধতিগুলিই ব্যবহার করে থাকে। সুতরাং, এই যুক্তি সংগতভাবেই উপস্থাপন করা যায় যে, কোনো রাজ্যের হালফিল ভোটার তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা সেই রাজ্যের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর এস্টিমেট সংখ্যার প্রায় সমান হওয়া উচিত।
এসআইআর প্রক্রিয়ার পরবর্তীকালে প্রকাশিত ভোটার তালিকাগুলি একটি অত্যন্ত অপ্রীতিকর ও বিস্ময়কর তথ্য উন্মোচন করেছে। যোগেন্দ্র যাদব তাঁর বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে, এসআইআর-পরবর্তী ভোটার তালিকায় উল্লিখিত ভোটারের সংখ্যা এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর এস্টিমেট সংখ্যার মধ্যে যে ব্যবধান বা অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে, তা বিস্ময়করভাবে অত্যধিক। এই পরিস্থিতি থেকে অনিবার্যভাবেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে হয় যে, এসআইআর প্রক্রিয়াটি আদৌ সর্বজনীন বা অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। বরং এই প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক ভোটার তালিকাভুক্তি থেকে বাদ পড়ে গিয়েছেন। নীচে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও তথ্যবহুল সারণি উপস্থাপন করা হল:
বিপরীতমুখী ফলাফল
উপর্যুক্ত সারণিতে, আদর্শগতভাবে, শেষ কলামে ১০০ শতাংশ থাকা উচিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আমরা কোনো ‘পারফেক্ট’ পৃথিবীতে বাস করি না। সরকার, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক গোষ্ঠীগুলির আন্তরিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও অল্পসংখ্যক প্রকৃত প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক হয়তো ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে যেতে পারেন। তবে, এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় এই ধরনের প্রচেষ্টা চোখে পড়ার মতোই অনুপস্থিত ছিল। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে হয় যে, বহু কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান নাগরিককে অবৈধ কারণে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের নাম যাতে অন্তর্ভুক্ত করা যায় তার জন্য ১৯৬৪ সালের নাগরিক অধিকার আইনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রে বিশেষ প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। ভারতে এবারের পরিস্থিতিকে তার সঙ্গেই তুলনা করা যেতে পারে, কিন্তু বাদ পড়া ভোটারদের অন্তর্ভুক্তির সেই উদ্যোগ দেখা গেল না। প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে যেন সকল যোগ্য ব্যক্তি ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন, তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্বটি ছিল ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ইসিআই) উপর। কিন্তু এর ঠিক উলটোটাই ঘটেছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার অধীনে নির্বাচন কমিশন একটি বৈরী মনোভাব থেকে নাগরিকদের উপরই তাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণের দায়ভার চাপিয়ে দিয়েছে! নিজ নিজ নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে ব্যর্থ ব্যক্তিদের অবিলম্বে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
সারণির শেষ কলামটি লক্ষ্য করলেই দেখা যায় যে, কয়েক লক্ষ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক—গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ—ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে গিয়েছেন। এই বাদ পড়া ব্যক্তিরা কি প্রাপ্তবয়স্ক? হ্যাঁ, অবশ্যই। তাঁরা কি দেশের নাগরিক? হ্যাঁ, অবশ্যই—যতক্ষণ না এর বিপরীত কিছু প্রমাণিত হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হল, তালিকা থেকে তাঁরা বাদ পড়লেন কেন?
যাঁদের নাগরিকত্ব প্রমাণিতভাবে অসত্য, কেবল সেইসব অ-নাগরিকদের (নন-সিটিজেন) ভোটার হওয়া রুখে দেওয়া পরিবর্তে—নির্বাচন কমিশন উলটে কয়েক লক্ষ যোগ্য নাগরিককেই ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে ‘সফল’ হয়েছে।
• লেখক সাংসদ ও ভারতের প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী। মতামত ব্যক্তিগত