সুতপা গুহ, গুয়াহাটি: ঘর নেই। উঠোন নেই। সাধের বাড়িটিও আর নেই। যেদিকে দু’চোখ যায় শুধুই জল। সেই জলই গ্রাস করেছে সংসারের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার সম্বল, সঞ্চয়, স্মৃতি। দিকে দিকে মানুষের হাহাকার, কান্না। তার মাঝেই নতুন প্রাণের স্পন্দন। শিবসাগর জেলার শিমুলগুড়িতে জন্ম নিল একটি নতুন জীবন। সদ্যোজাতের কান্নায় বাবা-মায়ের মুখে জয়ের হাসি, কিন্তু সেই কান্নার সঙ্গে মিশেছিল বন্যায় নিঃস্ব হয়ে যাওয়া এক বাবার অসহায় আর্তনাদ — ‘স্ত্রী আর সদ্যোজাত সন্তানকে নিয়ে এখন কোথায় যাব আমি? ঘর-বাড়ি কিছুই তো আর নেই।’
অসমের বন্যা এবছর শুধু নদীর বাঁধই ভাঙেনি, ভেঙে দিয়েছে হাজারও মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাপন। প্রায় ২ লক্ষের উপর পরিবার আজ গৃহহীন। তাদেরই একজন এই অসহায় বাবা। স্ত্রী সদ্য সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। অথচ নিজের বাড়িই এখন জলের নীচে। মাথা গোঁজার মতো একটি নিরাপদ আশ্রয়ও নেই। এই অবস্থায় তাঁদের সহায় এক মুসলিম পরিবার। তারা কোনো পরিচয় জানতে চায়নি। জানতে চায়নি জাত-সম্প্রদায়-ধর্মের কথা। তাদের সামনে শুধু এক সদ্যোজাত সন্তান আর তার অসহায় বাবা-মা। মায়ের শারীরিক অবস্থা ভালো নেই। অসহায়তার সেই দৃশ্যই সেই পরিবারকে নাড়িয়ে দেয়। সন্তান কোলে দম্পতিকে দেখে নিজের বাড়ির দরজা খুলে দেয় সেই মুসলিম পরিবার। বলেন, ‘আপনারা এখানেই থাকুন।’
জাত-ধর্মের বিভাজন ছাড়িয়ে সেই বাড়িতেই এখন নিরাপদে রয়েছেন হিন্দু দম্পতি ও তাঁদের সদ্যোজাত সন্তান। নতুন করে জল না বাড়লেও এখনও বন্যার জল চারদিকে থইথই করছে। আর তার মাঝেই জন্ম নিল এক মানবতার গল্প।
অসমের এখনও পাঁচ জেলার ৩৭৯টি গ্রাম বন্যা কবলিত। ৫৪টি ত্রাণ শিবিরে ১২ হাজার ৯৯৪ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। ১৫ হাজার ৪৩০ হেক্টর কৃষিজমি জলে নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তবে বেশকিছু জায়গায় বন্যার জল কিছুটা কমতে মানুষ নিজের বাড়ির খোঁজে গ্রামে ফিরছেন। সেখানকার দুর্দশারও করুণ ছবি সামনে এসেছে। ঘর-বাড়ির যেটুকু অবশিষ্ট আছে তা-ও থাকার অযোগ্য।
তবে অসমের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন মানুষের সব পরিচয়কে মুছে দিয়েছে। তখন কেউ হিন্দু নয়, কেউ মুসলিম নয়। এরা সবাই এক। সবাই কেবল বাঁচতে চাওয়া মানুষ। আর সেই মানুষকেই বাঁচিয়ে রাখে আরেক মানুষের বাড়িয়ে দেওয়া হাত।