


নিজস্ব প্রতিনিধি, বোলপুর: শ্যামলী খাস্তগীরের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে সেই কবেই। যে ভাবনা নিয়ে সোনাঝুরি হাট চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি, তার মূল উদ্দেশ্যই বদলে গিয়েছে। বর্তমানে সোনাঝুরির হাট থাকবে না কি সরে যাবে তা নিয়ে শান্তিনিকেতনে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। হাট নিয়ে মামলাও হয়েছে জাতীয় পরিবেশ আদালতে। বোলপুরের বিশ্ব ক্ষুদ্র বাজারে বিকল্প হাটের পরিকল্পনাও শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। তবে এসব নিয়ে আলোচনার মাঝেই কোথায় যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে জমি দখলের প্রসঙ্গ।
গত প্রায় এক দশকে সোনাঝুরি থেকে শুরু করে শান্তিনিকেতনের বিস্তীর্ণ এলাকার সরকারি খাসজমি, বনদপ্তরের জমি দখল হয়ে গিয়েছে। দখল হয়েছে সরকারি পাট্টার জমি, আদিবাসীদের জমিও। সেইসব জমিতে গজিয়ে উঠেছে একের পর এক বিলাসবহুল রিসর্ট, হোটেল। অনেকে জমি দখল করে বাড়ি নির্মাণও করেছেন। শান্তিনিকেতনে জমির দাম এখন আকাশছোঁয়া। কবিগুরুর ‘প্রাণের আরাম’ এখন জমি মাফিয়াদের স্বর্গরাজ্য। এইসব বেআইনি নির্মাণে জেলার পাশাপাশি লগ্নি রয়েছে কলকাতার বহু পুঁজিপতির। তাঁদের মাথায় হাত রয়েছে শাসকদলের দাপুটে নেতাদের। মদত রয়েছে প্রশাসনের পদস্থ কর্তাদের একাংশের।
সোনাঝুরিতে বনদপ্তরের জায়গা দখল করে একাধিক রিসর্ট ও ব্যক্তি মালিকানাধীন বাড়ি তৈরি হয়েছে। বহু জমির আবার চরিত্রও বদল হয়ে গিয়েছে। যা ১৯৮০সালের বন সংরক্ষণ আইনের পরিপন্থী বলে অভিযোগ। ওই রায়ে স্পষ্ট বলা আছে, বনভূমি হিসেবে ঘোষিত জমির উপর অ-বনজ কাজকর্ম কোনওভাবেই হতে পারে না। কিন্তু তা সত্ত্বেও কাদের মদতে হচ্ছে এইসব কারবার? পরিবেশপ্রেমীদের একাংশের অভিযোগ, স্থানীয় তৃণমূলের নেতাদের পাশাপাশি বনদপ্তর ও সরকারি আধিকারিকদের একাংশই এসব অবৈধ কারবারের সঙ্গে জড়িত। এসব নিয়ে বেশি তোলপাড় হলে নড়েচড়ে বসেন বনদপ্তরের কর্তারা। নিজেদের জমি চিহ্নিত করতে মাপজোকও করেন। কিন্তু ওখানেই শেষ। আজ পর্যন্ত অবৈধভাবে নির্মিত হোটেল, রিসর্ট ভেঙে দিয়ে জায়গা দখলমুক্ত করেছে এমন নজির নেই।
শুধু সোনাঝুরি নয়, গত কয়েক বছরে শান্তিনিকেতনের কোপাই নদীর তীর দখল করে তৈরি হয়েছে একের পর এক বেআইনি নির্মাণ। শ্রী হারিয়েছে কোপাই। গত বর্ষায় বেআইনিভাবে নির্মিত একটি রিসর্টে জল ঢুকে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছিলেন পর্যটকরা। যদিও তাতে বিশেষ হেলদোল নেই প্রশাসনের। গোয়ালপাড়ায় স্কুলের জমি দখল করে তৈরি হয়েছে রিসর্ট। কসবা পঞ্চায়েতে আদিবাসীদের পাট্টার জমি দখল করে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে উঠেছে বিলাসবহুল আবাসন। এনিয়ে আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু জমি মালিকের মাথায় শাসকদলের নেতাদের আশীর্বাদের হাত থাকার ফলে কিছুই হয়নি বলে অভিযোগ। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘জমি বেহাত আটকাতে সরকারি জমি চিহ্নিত করে বোর্ড বসানো হচ্ছে। পুরসভা থেকে শুরু করে সেচদপ্তর, বনদপ্তরও বোর্ড বসিয়েছে।’ তবে, দখল হয়ে যাওয়া জমি মুক্ত করতে পারেনি কোনও দপ্তরই।
সোনাঝুরির হাট নিয়ে টালবাহানায় শঙ্কিত ব্যবসায়ীরা। সোনাঝুরি হাট কমিটির সম্পাদক তন্ময় মিত্র বলেন, আমরা তো দুপুরে এসে বসছি, সন্ধ্যায় উঠে চলে যাচ্ছি। স্থায়ী কাঠামো পর্যন্ত নেই। কিন্তু আমাদের তুলে দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। অথচ, যারা জঙ্গল কেটে সরকারি জমি দখল করে হোটেল, রিসর্ট তৈরি করছে তাদের বেলায় প্রশাসন চুপ। প্রশাসন আগে অবৈধ নির্মাণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিক, তারপর না হয় আমাদের উচ্ছেদের বিষয়ে ভাববে। মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ বলেন, অবৈধ দখল হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নিক।