গত শতাব্দীর ছয়ের দশক থেকেই তাঁদের বলা হত তবলার ত্রিমূর্তি। পণ্ডিত শামতা প্রসাদ, পণ্ডিত কিষাণ মহারাজ এবং উস্তাদ আল্লা রাখা। ভারতের কোনও সঙ্গীত সম্মেলনে এই তিনজনের অনুপস্থিতির অর্থ হল, সেই সঙ্গীত সমারোহ উৎকর্ষের সীমা স্পর্শ করেনি। উস্তাদ আল্লা রাখার মন্ত্রই ছিল, সমষ্টিগতভাবে বেঁচে থাকা। একক নয়, তিনি মনে করতেন সঙ্গীত যেহেতু সংযোগের সেতু, তাই সকলকে নিয়েই এগতে হবে। অথচ, পাঞ্জাব ঘরানার অন্যতম শ্রেষ্ঠ তবলাবাদক উস্তাব আল্লা রাখা তাঁর তিন ছেলেকে আজীবন বলে গিয়েছেন একটি বিপরীত কথা! অবশ্যই নিজের ভালো লাগার জন্য বাজাবে। কিন্তু সূক্ষ্ম উপলব্ধি... প্রশ্নটা যেন থাকে যে, মানুষকে খুশি করতে পারছ তো? দুই উপদেশকেই যেন শিরা-উপশিরায় অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিলেন বড় ছেলে উস্তাদ জাকির হুসেন। তাঁর জন্মের পরই পিতা আল্লা রাখা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাহলে কি এই সন্তান পিতার জন্য দুর্ভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছিল? প্রশ্ন উঠেছিল পরিবারে। তখনই আচমকা এক সুফি সাধকের আবির্ভাব ঘটে। তিনিই বলেছিলেন, উল্টো হবে। এই ছেলে পিতা ও পরিবারের জন্য সৌভাগ্য নিয়ে আসবে। ওর নাম রাখা হোক জাকির হোসেন। সেই ছেলে যে তার অনবদ্য তবলা জাদুতে সকল স্তরের শ্রোতাকে মুগ্ধ করে রাখতে পেরেছেন, তা সর্বজনবিদিত। আবার ওই যে সকলের জন্য ভাববে, সকলকে নিয়ে চলতে হবে, সেই অমোঘ পরামর্শ বহন করেছেন নিজের জীবন পণ করে।
Advertisement
সাতের দশকে চেন্নাইয়ে সঙ্গীত আসরে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন উস্তাদ জাকির হোসেন এবং উস্তাদ আমজাদ আলি খান। তখন তো মাদ্রাজ। এয়ারক্র্যাফ্ট ল্যান্ডিংয়ের সঙ্গে সঙ্গে কেবিন ক্রু সতর্কতা জারি করে বললেন, দ্রুত আপনারা নেমে যান। প্লেনে একটা শর্ট সার্কিট হয়েছে। চমকে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে নেমে গেলেন। কিন্তু উস্তাদ আমজাদ আলি খানের কিছুক্ষণ পর মনে পড়ল, তাড়াহুড়োয় সরোদ তো আনা হয়নি! প্লেনের কেবিন ব্যাগেজে রাখার জায়গায় রয়ে গিয়েছে। প্লেনে যদি আগুন লাগে! ওই সরোদ পুড়ে যাবে। উস্তাদ জাকির হোসেন শুনে এক সেকেন্ডও দেরি করলেন না। নিমেষে ছুটলেন। প্লেনে তাঁকে কেউ উঠতে দেবে না। কারণ শর্ট সার্কিট। তিনি সকলের বাধা হেলায় অতিক্রম করে দ্রুত ঢুকে বের করে আনলেন আমজাদ আলির সরোদ। এই যে সহশিল্পীদের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়া, এই প্রবণতা চিরকাল তিনি বজায় রেখেছেন। ২০১৮ সালে কুতুব মিনার প্রাঙ্গণে প্রয়াত উস্তাদ রশিদ খানের মাইক্রোফোন কিছুতেই সড়গড় হচ্ছে না। দেখা গেল সবথেকে বেশি ছোটাছুটি করছেন যে ব্যক্তি, তাঁর নাম উস্তাদ জাকির হোসেন।
পাঞ্জাব ঘরানার তবলার বৈশিষ্ট্য হল, পাখোয়াজের একটি ব্যঞ্জনা থেকে যাবে। উস্তাদ আল্লা রাখার কাছে সেই ঘরানার দীক্ষা গ্রহণ করে পাঞ্জাব ঘরানাকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ এক সঙ্গীত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন জাকির হোসেন। তাই তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক। বিটলসের জর্জ হ্যারিসন কিংবা এই সেদিনের বারাক ওবামা! সকলেই ভক্ত একজনের—উস্তাদ জাকির হোসেন।
পাঞ্জাব ঘরানার তবলার বৈশিষ্ট্য হল, পাখোয়াজের একটি ব্যঞ্জনা থেকে যাবে। উস্তাদ আল্লা রাখার কাছে সেই ঘরানার দীক্ষা গ্রহণ করে পাঞ্জাব ঘরানাকে বিশ্বের দরবারে শ্রেষ্ঠ এক সঙ্গীত হিসেবে তুলে ধরেছিলেন জাকির হোসেন। তাই তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক। বিটলসের জর্জ হ্যারিসন কিংবা এই সেদিনের বারাক ওবামা! সকলেই ভক্ত একজনের—উস্তাদ জাকির হোসেন।



