সংবাদদাতা, বোলপুর: বনেরপুকুরডাঙার হীরালিনী দুর্গোৎসব এ বছর পঁচিশ বছরে পা দিল। বল্লভপুর অভয়ারণ্য সংলগ্ন খোয়াইয়ে আদিবাসী সংস্কৃতি মূর্ত হয়ে ওঠে এই পুজোয়। ওই পুজোর এ বছরের আকর্ষণ কাঠখোদাইয়ে তৈরি দুর্গামূর্তি। মাঝে বৃষ্টির কারণে মূর্তি ও মণ্ডপসজ্জায় বিঘ্ন ঘটলেও আবহাওয়া অনুকূল হতেই আশিস ঘোষের উদ্যোগে বাকি শিল্পীরা নতুন উদ্যমে কাজে ঝাঁপিয়েছেন। যদিও পুজো আসতে এখনও অনেকটা সময় বাকি, কিন্তু শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি যেন কোনওভাবে ব্যাহত না হয়, সে দিকেই এখন নজর শিল্পীদের।
২০০১ সালে কলকাতা গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজের ছাত্র তথা শিল্পী বাঁধন দাসের হাত ধরে সূচনা হয় হীরালিনী দুর্গোৎসবের। সোনাঝুরি রেণুতে ভরা খোয়াই, ময়ূরাক্ষী সেচ ক্যানালের জলধারা আর সবুজ ধানখেতের মাঝে নিস্তব্ধ গ্রাম্য পরিবেশে আদিবাসীদের নিয়ে শুরু হয়েছিল এই পুজো। প্রথম বছর তৈরি হয়েছিল টেরাকোটার মূর্তি, দ্বিতীয় বছরে কাঠ দিয়ে গড়া হয় দুর্গার রূপ। কিন্তু ২০০২ সালে শিল্পীর অকাল প্রয়াণে ধাক্কা খায় পুজো। তখন তাঁর ছাত্র আশিস ঘোষ দায়িত্ব নেন। তিনি ফাইবার কাস্টিং, বাঁশ, লোহা ইত্যাদি উপকরণে নতুন নতুন মূর্তি গড়ে তোলেন। ফলে পাঁচটি স্থায়ী দুর্গামূর্তি তৈরি হয়, যেগুলি বিসর্জন না দিয়ে প্রতিবছর নতুন সাজে মণ্ডপে স্থাপন করা হয়। দেবীর হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে পদ্মফুল দেওয়া হয় শান্তির প্রতীক হিসেবে। এবছরের কাঠের খোদাই করা নতুন মূর্তি, সেই ঐতিহ্যে আরও এক অধ্যায় যুক্ত হতে চলেছে।
বর্তমানে দুর্গাপুজো মানে থিম ও প্রাচুর্যের জোয়ার। অথচ হীরালিনী দুর্গোৎসবের লক্ষ্য প্রতিযোগিতা নয়, শিল্প ও আদিবাসী সংস্কৃতির সম্মিলনকে তুলে ধরা। প্রস্তুতির ফাঁকে শিল্পী আশিস ঘোষ বলেন, এই উৎসব আদিবাসীদের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনই বাইরের দর্শনার্থীদের কাছেও এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার। মহাসপ্তমী থেকে মহানবমী পর্যন্ত দিনভর চলে আদিবাসী নাচ-গান। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ছাড়াও প্রতিবেশী বিহার ও ঝাড়খণ্ড থেকে আসা শিল্পীরা ধামসা-মাদলের তালে তালে নিজেদের ঐতিহ্যকে মঞ্চে তুলে ধরেন। পুজোপ্রাঙ্গণে ধর্মীয় আচার-আচরণের পাশাপাশি মঞ্চ ও মণ্ডপ প্রাঙ্গণে বসানো হয় সাংস্কৃতিক আসর, যেখানে পরিবেশিত হয় লোকগীতি ও আদিবাসী নৃত্য। এই আবহেই দর্শনার্থীরা উপভোগ করেন শিল্প ও প্রকৃতির সার্থক মেলবন্ধন। গত বছর মহালয়ার দিনে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই পুজোর উদ্বোধন করেছিলেন। তবে এবছর ২৫ বছর পূর্তিতে উৎসব নতুন মাত্রা পাবে। খোয়াইয়ের লালমাটি, সোনাঝুরির রেণু আর সবুজ শস্যখেতের পটভূমিতে মণ্ডপ সেজে উঠেছে। দশমীর দিন ঘট বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পুজোর সমাপ্তি হলেও, হীরালিনী দুর্গোৎসব বীরভূম তথা সমগ্র রাজ্যে শিল্প ও আদিবাসী সংস্কৃতির মিলনমঞ্চ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। এবছরের কাঠের খোদাই করা ষষ্ঠ মূর্তি সেই সুনামকে আরও সমৃদ্ধ করবে বলে আশা আয়োজক তথা শিল্পীদের। • নিজস্ব চিত্র