সুখেন্দু পাল, বর্ধমান: খুব দেরিতে হলেও টনক নড়ল বঙ্গ বিজেপির। ভুলভাল বাংলা বলার চেয়ে না বলাই ভালো। অতঃপর, হিন্দি বলয়ের নেতাদের সভায় বক্তব্য রাখার ব্যাপারে এবার লাগাম টানল রাজ্য নেতৃত্ব। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় জনসংযোগ কর্মসূচি কিংবা ছোটখাটো জনসভাতে হিন্দিভাষী নেতাদের ভাষণে যতটা সম্ভব রাশ টানার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। তাঁদের জায়গায় বাংলার নেতাদের বেশি করে সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ‘কার্যকর্তা’, ‘প্রভারী’, ‘ভাজপা’র মতো বিজেপির সাংগঠনিক শব্ধবন্ধগুলি ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে বলেও ওই সূত্রটির দাবি। স্বাভাবিকভাবেই, দলের নীচুতলা থেকে প্রশ্ন উঠে আসছে—তা হলে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে ভিনরাজ্যের হেভিওয়েট নেতাদের বাংলায় এনে লাভ কী হল? তা ছাড়া দিল্লির শীর্ষনেতা যেমন, মোদি-শাহ-নাড্ডারা তো আর বাংলায় ভাষণ দেবেন না। তাঁদের বেলায় কি হবে? এভাবে কি বাঙালির অস্মিতাকে ছুঁয়ে ভোট বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব? নাকি বাঙালির মনে দাগ কাটা যাবে?
বাংলা বিজয়ের স্বপ্ন নিয়ে এবারও আদাজল খেয়ে ঝাঁপিয়েছে বিজেপির দিল্লি নেতৃত্ব। কিন্তু, বাংলার নেতাদের উপর তারা আস্থা রাখতে পারছে না। তাই, ভোট ঘোষণার অনেক আগে থেকেই প্রচুর টাকা খরচ করে নামানো হয়েছে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, মধ্যপ্রদেশের মন্ত্রী-নেতাদের। তাঁদের নিয়ে বঙ্গ বিজেপির অন্দর দ্বিধাবিভক্ত। একটা অংশ বাংলায় যোগ্য নেতাদের উপর দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে সওয়াল করছে। একটা অংশের ধারণা, হিন্দিভাষী নেতাদের ঘনিষ্ঠ হতে পারলে দ্রুত উত্থান হতে পারে। এই সম্ভাবনা থেকে বাংলার অনেক নেতাই ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁদের বক্তব্যে হিন্দিভাষা ব্যবহার করছেন। তাতে হিতে বিপরীত হচ্ছে। ‘কার্যকর্তা’, ‘প্রভারি’র মতো শব্দবন্ধগুলি বাঙালির কানে ভালো ঠেকে না।
বিজেপি সূত্রের খবর, ক’দিন দলের একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক হয়। সেখানে ঠিক হয়েছে, খুব প্রয়োজন ছাড়া হিন্দি শব্দ বক্তব্যে ব্যবহার করা যাবে না। সহজ সরল বাংলা ভাষাতেই বাঙালির মনজয় করতে হবে। সেক্ষেত্রে বক্তব্য রাখার সময় বিখ্যাত কবি বা লেখকদের কবিতার লাইন উদ্ধৃতি করা যেতে পারে। কোনও গ্রামীণ এলাকায় হিন্দিভাষী কোনও নেতা যাতে বক্তব্য না রাখেন, তা নিয়েও সতর্ক করা হয়েছে। ব্যতিক্রম খড়গপুর, আসানসোল বা শিলিগুড়ির ক্ষেত্রে। এসব এলাকায় হিন্দিতে বক্তব্য রাখলেও কোন সমস্যা নেই। কিন্তু কলকাতা, বর্ধমান, হুগলির মত জেলাগুলিতে শুদ্ধ বাংলাতেই বক্তব্য রাখতে হবে। বিজেপি নেতা প্রধানচন্দ্র পাল বলেন, ‘কিভাবে বক্তব্য রাখতে হবে, তা নিয়ে আমাদের দলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এতদিন সাংগঠনিক স্তরে বেশ কিছু হিন্দি শব্দ ব্যবহার করা হতো। এখন সেগুলি প্রকাশ্যে না বললেই ভালো।’
বিজেপি সম্পর্কে অনেকেরই ধারণা হিন্দি ভাষাভাষীদের দল। নেতারা হিন্দিতে বক্তব্য রাখলে সেই ধারণা আরও দৃঢ় হয়। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে গেরুয়া নেতাদের অনেক কিছুই খাপ খায় না। আমজনতা ভালোভাবে নেয় না। সেই কারণেই বাঙালি সাজার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিজেপি। রাম-নামে বাংলায় ভোট টানা সম্ভব নয় বুঝে নেতারা এখন জয় মা কালী, মা দুর্গার নাম নিচ্ছেন। হরিনাম সংকীর্তনেও বাঙালির মন ভোলাতে চাইছেন। বিজেপির এক প্রবীণ নেতা ঘরোয়া আড্ডায় বলছিলেন, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দল করছেন, তাঁরা বাঙালি সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে বক্তব্য রাখেন। কিন্তু নতুন যাঁরা এসছেন তাঁরা অতি বিজেপি হিসেবে তুলে ধরতে হিন্দি শব্দবন্ধ ব্যবহার করছেন। রাজ্য থেকে এখন তাঁদের স্পষ্ট বার্তা দিয়ে দেওয়া হয়েছে, বাংলা ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় বক্তব্য রাখা যাবে না।