বলরাম দত্তবণিক, রামপুরহাট: জগন্নাথ’ শব্দের অর্থ জগতের নাথ বা ঈশ্বর। আর সেই বিশ্বাস থেকেই সনাতন ধর্মে যুগ যুগ ধরে রথের রশিতে টান দিয়ে আসছেন আপামর পুণ্যার্থী। তবে, বীরভূমের তারাপীঠের রথযাত্রার ইতিহাস ও ঐতিহ্য ভারতের আর পাঁচটা জায়গার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, এখানে রথের উপর জগন্নাথ, বলরাম বা সুভদ্রা নন, স্বয়ং তারামাই জগন্নাথের প্রতিভুরূপে আরোহণ করে নগর পরিক্রমায় বের হন। একাধারে তিনি কালী, অন্যদিকে তিনিই কৃষ্ণ, এই অনন্য ‘অভেদ’ তত্ত্বেরই অসামান্য উদ্যাপন দেখা যায় তারাপীঠের এই ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রায়। এবার পুরনো রথের শুধুমাত্র দু’টি চাকা এবং ধুরি(এক্সেল) অপরিবর্তিত রেখে নতুন করে নির্মিত রথে চড়বেন দেবী তারা। এদিকে সবার গুরু বৃহস্পতি। আর বৃহস্পতির গুরু দেবী তারা। সপ্তাহের এই বিশেষ দিনে মন্দিরে ব্যাপক ভক্ত সমাগম ঘটে। এবার রথযাত্রা উৎসব বৃহস্পতিবার হওয়ায় দেবী ব্যতিক্রমী নবরূপের রথ দর্শনে রেকর্ড সংখ্যক পুণ্যার্থীর সমাগম হবে বলে আশা মন্দির কমিটির সভাপতি নিখিল বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
এই ব্যতিক্রমী রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর আগে, অষ্টাদশ শতাব্দীর আটের দশকে। সাধক দ্বিতীয় আনন্দনাথ, নাটোরের রাজা ও তারাপীঠের তৎকালীন জমিদার সাধক রামকৃষ্ণের সহায়তায় এই উৎসবের সূচনা করেন। তবে, পরবর্তীকালে মহাশ্মশানের মহাসাধক বামাক্ষ্যাপার আবির্ভাবের পর এই উৎসব এক অন্য মাত্রা পায়।
তারাপীঠ মন্দিরের গবেষক তথা সেবাইত প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ‘সাধক বামা নিজে রথের দড়ি ধরে নিতাই-গৌরের মতো ‘হরে কৃষ্ণ, হরে রাম’ ধ্বনি দিয়ে কীর্তনীয়া ও ভক্তদের নিয়ে মেতে উঠতেন’। সেই সময় গোরুর গাড়ির চাকা লাগানো একটি কাঠের রথে দেবী তারাকে বসিয়ে তৎকালীন চণ্ডীপুর(আজকের তারাপীঠ) গ্রাম প্রদক্ষিণ করানো হতো। পরবর্তীকালে কলকাতার আশালতা সাধুখাঁ নামের এক ভক্তের সৌজন্যে এখানে রথ ঘর তৈরি হয়, যার উদ্বোধন করেছিলেন ১৯৭০ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই কাঠের রথ আজ রূপ নিয়েছিল সুদৃশ্য পিতলের রথে। তবে, এবার সেগুন কাঠ দিয়ে দেবীর নতুন রথ তৈরি করা হয়েছে।
এখানে রথযাত্রার মূল আকর্ষণ দেবীর রাজবেশে নগর পরিক্রমা ও চকোলেটের প্রসাদ। মন্দিরের অন্যতম সেবাইত তারাময় মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রথযাত্রার দিন বিকেল ঠিক তিনটে নাগাদ মা তারা গর্ভগৃহ থেকে বেরিয়ে এসে রথে আরোহণ করবেন। দেবীকে সাজানো হবে রাজবেশে। রথের উপর মাকে চিঁড়ে, বাতাসা, প্যাড়া এবং ভক্তদের দেওয়া চকোলেট উৎসর্গ করা হবে। পরে সেই প্রসাদ ভক্তদের উদ্দেশে ছুড়ে দেওয়া হবে, যা কুড়িয়ে নিতে প্রতি বছর ভক্তদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। মন্দির কমিটির সম্পাদক পুলক চট্টোপাধ্যায় বলেন, এই প্রথমবার রথযাত্রা উৎসব উপলক্ষ্যে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে তারাপীঠ মন্দির কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদান দেওয়া হয়েছে। স্বভাবতই এবার রথযাত্রার আড়ম্বর কয়েকগুন বাড়বে।
গোটা তারাপীঠ প্রদক্ষিণ করে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ দেবী আবার মূল মন্দিরে ফিরে আসবেন। এরপর বিশেষ পুজো ও সন্ধ্যারতি শেষে রাতে মাকে লুচি, সুজি ও পাঁচরকম ভাজা দিয়ে বিশেষ ভোগ নিবেদন করা হবে। ভক্তদের বিশ্বাস, বছরের এই একটা দিনে দেবী নিজে ভক্তদের দর্শন দিতে বাইরে আসেন এবং মায়ের রথের দড়িতে টান দিতে পারলে সব রকম বিপদ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রথযাত্রার বেশ কয়েকদিন আগেই অনলাইনে সিংহভাগ হোটেল বুকিং হয়ে যায়।
রথযাত্রা চলাকালীন কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা বা বিদ্যুৎ বিপর্যয় এড়াতে প্রশাসনের তরফ থেকে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশের এক কর্তা জানিয়েছেন, রথ চলাকালীন গোটা তারাপীঠ এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হবে। তারাপীঠে ডাবল লেনের রাস্তা হওয়ায় যানজট এড়ানো সহজ হবে। রাস্তার এক লেন দিয়ে রথ যাবে এবং অন্য লেনে দাঁড়িয়ে ভক্তরা দর্শন করতে পারবেন। অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে রাস্তার দু’ধারে পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকবে।