নিজস্ব প্রতিনিধি, আসানসোল ও সংবাদাদাতা, দুর্গাপুর: দুর্গাপুরে নাবালকদের রক্ত লুটের তদন্ত করতে গিয়ে বড় চক্রের সন্ধান পেল আসানসোল দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট। একাধিক বেসরকারি মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ থাকায় দক্ষিণবঙ্গের হেলথ হাব হিসাবে পরিচিত দুর্গাপুর। ভিন রাজ্য এমনকী ভিন দেশ থেকেও রোগীকে নিয়ে আসেন তাঁদের আত্মীয় পরিজন। তখনই বিভিন্ন হাসপাতাল প্রয়োজনে অপ্রয়োজনেও রোগীর পরিবারকে ব্লাড ডোনার জোগাড় করতে বলে। এই কৃত্তিম রক্তসংকট দেখানোর ফলে বহুক্ষেত্রে বহিরাগত মানুষরা দালালের খপ্পরে পড়ছেন। সেই ব্লাড র্যাকেট অর্থের বিনিময়ে ডোনার জোগাড় করছে। নাবালকদেরও টাকা দিয়ে ডোনার সাজাচ্ছে তারা।
জানা গিয়েছে, এই চক্রের সূত্রপাত হচ্ছে নামজাতা হাসপাতাল সংলগ্ন এলাকা থেকে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ বহিরাগত রোগীর আত্মীয়দের রক্ত দেওয়ার জন্য ডোনার জোগাড় করতে বলে। নতুন জায়গায় রক্তদাতা জোগাড় করতে মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে রোগীর ঘনিষ্ট আত্মীয়দের। তাঁরা উদভ্রান্তের মতো চায়ের দোকান, হোটেল, এমনকী যে সব রুমে তাঁরা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকেন তাঁদের রক্ত জোগাড় করতে অনুরোধ ধরেন। তখনই সক্রিয় হয় দালালরা। রক্ত জোগাড় করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রোগীর আত্মীয়দের কাছে তাঁরা তখন ‘দেবদূত’। এরপরই রক্তর ইউনিট পিছু চড়া দাম হাঁকে মূল দালাল। রোগীর আত্মীয়দের রাজি হওয়ার ছাড়া উপায় থাকে না। হাসপাতালের সামনে থাকা দালাল, তার নেটওয়ার্কে থাকা এজেন্টদের রক্তের ব্লাড গ্রুপ জানিয়ে বার্তা পাঠায়। এজেন্টরা তখন অর্থের বিনিময়ে ডোনার জোগাড় করতে নেমে পড়ে। সাবালকদের কাছে এই রক্ত দেওয়ার প্রস্তুব দিলে পুলিশে জানাজানির ভয় থাকে। তাই তারা টার্গেট করে স্কুল, কলেজের পড়ুয়াদের। প্রথমত, মেগা সিটির পড়ুয়াদের পকেট মানি জোগাড়ের প্রবল ইচ্ছে থাকে। দ্বিতীয়ত পরিবার জেনে যাওয়ার ভয়ে তারাও বিষয়টি গোপন রাখার প্রতিশ্রুতি দেয়। কয়েক বছর ধরেই নীরবে এই মরণ খেলা চলছে। পুলিশি তদন্তে এও উঠে এসেছে এক একজন নাবালক খুব কম সময়ের ব্যবধানে একাধিক বার রক্ত দিয়েছে। এতে তাঁরা শরীরে স্থায়ী ক্ষতিরও আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে বেসরকারি হাসপাতাল নাবালকদের রক্ত নিচ্ছে তাঁদের ভূমিকা নিয়ে। প্রথমত, হাসপাতালগুলির দাবি, তাঁরা রোগীর আত্মীয়দের দেওয়া ডোনারের মাধ্যমেই রক্ত সংগ্রহ করে। নিশ্চয়ই তাঁদের জানা উচিত কী উদ্দেশে ডোনার রক্ত দিচ্ছে। অভিযোগ, ১৩, ১৪ বছরের ছেলেরাও রক্ত দিয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই একজন ১৩ বছরের ছেলেকে দেখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর তাঁকে সাবালক ভাবার কোনো কারণ নেই। তাহলে কি হাসপাতালের লোকজনও জড়িত অসাধু চক্রে? জানা গিয়েছে, পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
ডিসি রসপ্রীত সিং বলেন, তদন্তে একাধিক নতুন দিক উঠে এসেছে। যে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষর বিরুদ্ধে নাবালকদের রক্ত নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁদের নথি যাচাই করা হচ্ছে। আমরা দেখতে চাইছি কী কী নথি দেখে তারা রক্ত নিয়েছে। কোন রোগীর সাপেক্ষে তাঁরা রক্ত সংগ্রহ করেছে।
বসে নেই স্বাস্থ্যদপ্তরও। বিষয়টি নিয়ে কঠোর পদক্ষেপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অগ্নিমিত্রা পাল। জানা গিয়েছে, ব্লাড সেফটির জেলা প্রোগ্রাম অফিসারকে তদন্ত করে রিপোর্ট জমা দিতে বলেছেন স্বাস্থ্যদপ্তরের কর্তারা।