যিনি কৃষ্ণ তিনিই কালী, কেওড়াতলায় ১৫০ বছরের প্রাচীন কৃষ্ণকালী মন্দির
  • ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

কলহার মুখোপাধ্যায়, কলকাতা: মূর্তিটি একবার মনে হবে কালীর। পরক্ষণেই মনে হবে ইনি তো কৃষ্ণ! একই অঙ্গে এত রূপ দেখিনি তো...কৃষ্ণের লীলা বোঝা ভার। কালীর মহিমাও অপার। যিনি কৃষ্ণ তিনিই কালী হয়ে বিরাজ করেন সাধনক্ষেত্রে। তন্ত্রস্থান কলকাতাতেও আছেন কৃষ্ণকালী। থাকেন কেওড়াতলায়। শ্মশানে কাঠের চুল্লি যেখানে জ্বলে, তার ঠিক পাশেই তাঁর মন্দির।  

Advertisement

পুরাণ, ধর্মতত্ত্ব ও উপাখ্যানে কৃষ্ণকালীর তাৎপর্য গভীর। সবথেকে প্রচলিত কাহিনিটি হাজারবার শুনেও পুরনো হয় না। কালীপুজোর আগে মন্দিরের দরজায় দাঁড়িয়ে গল্পটি শোনাচ্ছিলেন মন্দিরের পুরোহিত স্বপন চক্রবর্তী।
আদিগঙ্গা এখন মজে যাওয়া খাল বটে তবে এখনও সন্ধ্যার মুখে নদীর বুকে হেমন্তের বাতাস বয়। সে হাওয়া মনে হয় অনেক প্রাচীন শীতকাল ছুঁয়ে বয়ে আসছে। যেন কৃষ্ণর বৃন্দাবন থেকে উড়ে আদিগঙ্গায় এসে ঢেউ তুলছে। শিরশিরে হাওয়া আর শ্মশানের আলোআঁধারির অনুভূতির মধ্যে স্বপনবাবুর গলা তখন কেমন অলৌকিক শোনায়।  
‘রাধা যখন কৃষ্ণের বাঁশি শুনতে পেতেন তখনই ছুটতেন কুঞ্জবনে, কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। একদিন তাঁর ননদ ও শাশুড়ি জটিলা ও কুটিলা সে খবর পেয়ে রাধার স্বামী আয়ান ঘোষ঩কে নালিশ করলেন। আয়ান লাঠি হাতে চললেন উচিত শিক্ষা দিতে। কৃষ্ণ সর্বজ্ঞানী। সব বুঝতে পারলেন। তারপর রাধাকে বললেন, কিছু ফুল এনে পুজোয় বসতে। এবং কালীভক্ত আয়ান ঘোষের আরাধ্য দেবী কালীর রূপ ধারণ করে দাঁড়ালেন রাধার সামনে। আয়ান এসে পৌঁছলেন বনে। দেখলেন কৃষ্ণ সেখানে নেই। বরং তাঁর নিজের ইষ্টদেবী দাঁড়িয়ে, রাধা তাঁর পুজো করছেন। এ দৃশ্য দেখে ক্রোধ গেল উবে। আপ্লুত হয়ে স্তব শুরু করলেন আয়ান।’ 
ধর্মীয় ব্যাখ্যায় কৃষ্ণকালী হলেন বৈষ্ণব ও শাক্ত এই দুই ভাবধারার মিলন সেতু। তন্ত্র ও পুরাণ মতে, যিনি কৃষ্ণ, তিনিই কালী। কৃষ্ণ হলেন কালীর পুরুষ শক্তি।
এই কৃষ্ণকালীকেই দেখা যায় কেওড়াতলায়। শোনা যায়, প্রায় দেড়শো বছর আগে আদিগঙ্গার তীরে কেওড়াতলা শ্মশান তখন জঙ্গলে ভরা। ১৮৬২ সালে শ্মশানঘাট প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সে সময় সাধক আনন্দ ঋষি নামে এক তন্ত্রসাধক এখানে আসেন। শ্মশানের এক কোণে গঙ্গার ধারে সাধনা শুরু করেন। দর্শন পান, মহাশক্তি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে একাত্ম হয়ে রয়েছেন। এই অলৌকিক দৃশ্য দেখার পর আনন্দ ঋষি প্রতিষ্ঠা করেন কৃষ্ণকালী বিগ্রহ। সাধনা করেন। সিদ্ধিলাভ করেন।  এরপর আর এক সাধক আসেন। তাঁর নাম অনাথানন্দ। তিনিও আধ্যাত্মিক সাধনা করেন এখানে। এই দুই সাধকের প্রভাবেই মন্দির মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অলৌকিক জায়গা হিসাবে পরিচিতি পায়।
কেওড়াতলা ভিড়ে ঠাসা থাকে বটে। তবে কৃষ্ণকালীর মন্দিরের জায়গাটি অপেক্ষাকৃত নির্জন। কাঠের চুল্লির ধোঁয়া মেখে বাতাস এখানে সর্বদাই ভারী। সে বাতাস চিরে কালীপুজোর আলো এখন ছড়িয়ে পড়ছে। সে আলোয় কৃষ্ণকালী আরও উজ্জ্বল। তাঁকে দেখে চোখ ফেরানো যায় না। এ বছর কালীঘাটে ঠাকুর দেখতে গেলে কৃষ্ণকালীর দর্শন অবশ্য দ্রষ্টব্যের তালিকায় থাকুক কালীভক্তদের।