


অভ্যাস ও বৈরাগ্যের দ্বারা ওই বৃত্তিগুলি নিরুদ্ধ করা যায়। গীতাতে যখন অর্জুন কৃষ্ণকে প্রশ্ন করছেন, “মন বড়ই চঞ্চল, তাকে কি প্রকারে বশে আনা উচিত”—তখন শ্রীকৃষ্ণ এই উত্তর দিচ্ছেন, “অভ্যাসেন তু কৌন্তেয় বৈরাগ্যেণ চও গৃহ্যতে।” গীতাতে অভ্যাসযোগের চর্চা বিশেষরূপে করা হয়েছে। যে কোন সিদ্ধি অভ্যাসনির্ভর। পতঞ্জলি অভ্যাস শব্দ বিশেষ অর্থে ব্যবহার করেছেন। তিনি বলছেন—“তত্র স্থিতৌ যত্নোহভ্যাসঃ।”-সেই স্থিতিতে থাকবার প্রযত্ন হল অভ্যাস। এই প্রযত্নকে ভাষ্যকারগণ বীর্য্য বলেছেন। বীর্য্যকে যোগের উপায়স্বরূপ মানা হয়েছে। নিজের ভিতর এক দৃঢ়সংকল্প, কোনও অবস্থাতে পিছু না হটবার সংকল্প, নিষ্ঠাপূর্বক সাধনামার্গে লেগে থাকা, এই অভ্যাস দীর্ঘকাল পর্য্যন্ত নিরন্তর সৎকারের সাথে অর্থাৎ আনন্দপূর্বক করতে থাকলে সাধক এক দৃঢ়ভূমির স্থিতি প্রাপ্ত করেন। সূত্র হল—“স তু দীর্ঘকাল নৈরন্তর্য সৎকারাসেবিতো দৃঢ়ভূমিঃ।” সৎকার হল চিত্তের উৎসাহ। এটির অভ্যাস হল অষ্টাঙ্গমার্গের অভ্যাস। যোগ এক দিনে হয় না। অনেকদিন পর্য্যন্ত অভ্যাসের প্রয়োজন আছে। “নিশ্চয়েন যুক্তব্যো অনির্বিন্নচেতসা। এই উৎসাহ আর বীর্য্যই হল চিত্তের অনির্বিণ্ণতা। এই সাধনার জন্য যোগ্য বাতাবরণ প্রয়োজন। এই বাতাবরণকে বৈরাগ্যের দ্বারাই প্রস্তুত করা যেতে পারে। বৈরাগ্য মুখ্যতঃ দুই প্রকার—বিষয় বৈতৃষ্ণা আ গুণবৈতৃষ্ণ্য।
দৃষ্ট অথবা শ্রুত সর্বপ্রকার বিষয়ের প্রতি যাতে বিতৃষ্ণা বা বৈরাগ্য উৎপন্ন হয় আর যাতে তাকে বশ করবার শক্তি তৈরী হয়, তাকে বৈরাগ্য বলে। বিষয় দুই প্রকার-দ্রৃষ্ট আর শ্রুত (অনুশ্রবিক)। যে সমস্ত বিষয়ের কথা স্মৃতিতে বলা হয়েছে বা পরম্পরায় শুনে আসছি—তাকে শ্রুত বিষয় বলা হয়। প্রথমাবস্থায় বিষয়কে বাইরেই ইন্দ্রিয় দ্বারা ভোগ করতে চাই। কিন্তু যখন চেতনাকে অন্তর্মুখী করা হয় তখন মনে এই ভাবনার প্রাবল্য হয় যে অন্তরেই ইন্দ্রিয়সুখ বা আনন্দের ভোগ মিলবে। বিভূতিও একপ্রকার বিষয়ই। ব্যাখ্যাকার বলেন যে যখন যোগ বিক্ষিপ্তভূমিতে প্রবর্তিত হয়, তখন বিভূতির প্রতি লোভ থেকে যায়। কোন এক স্থিতির প্রতি লোভ, শুধু এইটুকুই নয়-কৈবল্যের প্রতি লোভ, ইষ্ট মিলনের আকাঙ্ক্ষা এইসব চিত্তের বিকল্প হতে উৎপন্ন হয় আর যোগবিঘ্ন মানা হয়। কোনও অনুভূতি চিরস্থায়ী নয় আর তাকে পূর্ণরূপে মিথ্যাও মানা হয় না। কোন অনুভূতির স্থায়িত্বের প্রতি আসক্তি থাকা উচিত নয়। তার গহনে চিত্তকে প্রোথিত করা দরকার। সমস্ত দূর করে অন্তরে এক শূন্যতার অমুভব হওয়া দরকার। দৃষ্ট তথা আনুশ্রবিক বিষয়ের প্রতি তৃষ্ণা বর্জন করতে হবে। “ন চাস্য সর্বভূতেষু কশ্চিদ্ অর্থ ব্যপাশ্রয়ঃ।” গীতার এই মন্তব্যে বৈরাগ্য আর বিষয় বৈতৃষ্ণ্যের কথাই বলা হয়েছে। তুলনীয় রামপ্রসাদের “আপনাতে মন আপনি থাকো, যেওনা কারো কাছে।” এছাড়া গীতাতে আরও বলা হয়েছে—“বিষয়া বিনিবর্তন্তে নিরাহারস্য দেহিনঃ। রসবর্জং—রসোহপ্যস্য পরং দৃষ্ট্বা নিবর্ততে।”
শ্রীমৎ অনির্বাণ রচিত ‘অনির্বাণ আলোয় পাতঞ্জল যোগ-প্রসঙ্গ থেকে