প্রদীপ্ত চৌধুরী, ঝাড়গ্ৰাম: ব্রাহ্মণ নয়, শবরদের হাতেই পূজিত হন গুপ্তমনি দেবী দুর্গা। ঝাড়গ্রামের মানিকপাড়ায় দেবীর মন্দির। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত দেবীর পুজো হয়। লৌকিক প্রথা অনুযায়ী দশমীতেই ঘট প্রতিষ্ঠা ও বিসর্জন হয়।জঙ্গলভূমির বিপদসঙ্কুল পথে বনদেবী অরণ্যবাসীদের নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছে দেন। চারশো বছর ধরে চলে আসা এই পুজো ঘিরে নানা কিংবদন্তি ছড়িয়ে আছে।
ঝাড়গ্রামের খেমাশুলি ও লোধাশুলি ছিল গভীর জঙ্গলে ভরা। দস্যুরা বনের পথে ডাকাতি করত। জঙ্গলের পথ নিরাপদে পার হতে স্থানীয় বাসিন্দারা গুপ্তস্থানে থাকা প্রস্তরখণ্ডকে পুজো করতেন।কথিত আছে, জঙ্গলের অধিপতি নন্দা ভুক্তা একদিন বনদেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে জঙ্গলের ভিতর শাহাড়া গাছের নীচথেকে বের করে পুজো করার নির্দেশ দেন। বনরাজা নন্দ বনের ফলমূল দিয়ে দেবীর পুজো করেন। গুপ্তস্থান থেকে দেবীর আবির্ভাব হয়েছিল বলে তিনি গুপ্তমণি নামে পরিচিত হন। দেবী গুপ্তমণির প্রসঙ্গে ঝাড়গ্রামের রাজা রঘুনারায়ণ মল্লদেবের প্রিয় হাতির ঘটনাও চলে আসে। গড় থেকে রাজার প্রিয় হাতি সকলের চোখে ধুলো দিয়ে জঙ্গলে দেবীগুপ্ত মণির স্থানে চলে যায়। হাতির সন্ধান না পেয়ে রাজা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েন। দেবী তাঁকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে শবররাজ নন্দভুক্তর কাছে যেতে বলেন। দেবীর আদেশে শবর অধিপতি নন্দের সঙ্গে রাজা দেখা করেন। জঙ্গলে গুপ্তমণির অধিষ্ঠান স্থলেই হাতির দেখা পান। মন্দিরের গর্ভগৃহে মাকরা পাথরে খোদাই করা দ্বিভুজা দেবী মূর্তি রয়েছে।গর্ভগৃহে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানো হয়না। শুধু প্রদীপ জ্বলে। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, দেবী নিজেকে গোপন রাখতে পছন্দ করেন। মন্দিরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বালানোর চেষ্টা করা হলেও বারে বারে তা বাধাপ্রাপ্ত হয়। ওড়িশার শৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত। রঘুনারায়ণ মল্লদেব প্রথম মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মন্দিরটির একাধিকবার সংস্কার করা হয়। বর্তমান রাজ্য সরকার ২০২০ সালে ভগ্ন গুপ্তমনি মন্দির সংস্কারের জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। মন্দিরটির সংস্কারের কাজ চলছে। আঞ্চলিক গবেষক মধুপ দে জানালেন, নন্দভক্তের বংশধর দীপু ভক্তেরবক্তব্য অনুযায়ী,শতাব্দী ধরে বনদুর্গা গুপ্তমণির পুজো হয়ে আসছে। মন্দিরে সারা বছর ধরে পুজো হয়। দুর্গাপুজোর চারদিন ধুমধাম করে পুজো করা হয়। ছাগবলি হয়। দশমীর দিন ঘট ভরে সেদিনই ঘট বিসর্জন হয়। ভক্তরা বিশ্বাস করেন, দেবী তাঁদের মনস্কামনা পূরণ করেন। আঞ্চলিক গবেষক মধুপ দে বলেন, জঙ্গলমহলের প্রতিটি পুজোর সঙ্গে স্থানীয় লোকবিশ্বাস মিলেমিশে আছে। জঙ্গল এলাকার মানুষ বনদেবীর পুজো করত। দেবী গুপ্তমণির নাম সকল স্তরের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। • নিজস্ব চিত্র