Bartaman Logo
৯ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

কথা রাখার গ্যারান্টি

নির্বাচন এলে জনগণকে দুধে-ভাতে রাখার স্বপ্ন দেখাতে রাজনৈতিক দলগুলির দেদার প্রতিশ্রুতি দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বিশেষত এদেশে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাটাই আসল সত্য হয়ে উঠেছে।

কথা রাখার গ্যারান্টি
  • ২২ মার্চ, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

নির্বাচন এলে জনগণকে দুধে-ভাতে রাখার স্বপ্ন দেখাতে রাজনৈতিক দলগুলির দেদার প্রতিশ্রুতি দেওয়াটাই দস্তুর। কিন্তু ইতিহাস বলছে, বিশেষত এদেশে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাটাই আসল সত্য হয়ে উঠেছে। উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রগুলি নিয়ে প্রায় ‘কল্পতরু’ হয়ে ওঠার মতো প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সরকার গঠনের পর তা নিয়ে আর কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। এর প্রমাণ পেতে বেশি পিছনে হাঁটার দরকার নেই। কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির যে সরকার গত প্রায় বারো বছর ধরে ক্ষমতায় রয়েছে, তার আমলে তিনটি লোকসভা ভোটের আগে বিজেপির দেওয়া প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবের ছবিটা দেখলেই নির্মম সত্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠবে। বছরে ২ কোটি বেকারের চাকরি, প্রত্যেক নাগরিকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নগদ ১৫ লক্ষ টাকা জমা করা, কালো টাকা উদ্ধার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, শিক্ষা-স্বাস্থ্যে বিশেষ নজর, শিল্পে বিনিয়োগ, কৃষকের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য— এমন অসংখ্য প্রতিশ্রুতি পূরণের অঙ্গীকার যে দিনের আলো দেখেনি, তা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সমীক্ষা রিপোর্টেই উঠে এসেছে। এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল উন্নয়ন ও সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের মানচিত্রে ভারত ক্রমশ নীচের দিকে নেমে যাচ্ছে। 

Advertisement

গোটা দেশে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের এই চেনা ছবিটা যেন এ রাজ্যে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। সৌজন্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় কোনো একটি অঙ্গ রাজ্যের পক্ষে যে জনগণের যাবতীয় মৌলিক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়— তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু কোনো রাজ্যের শাসক দল তথা সরকারের সদিচ্ছা থাকলে যে সাধারণ নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষা দিয়ে তাদের ভালো রাখার চেষ্টা করা যায়— গত পনেরো বছর ধরে মমতা সরকার তার প্রমাণ দিয়ে চলেছে বারবার। এ রাজ্যে তাই জন্ম থেকে মৃত্যু, জীবনধারণের প্রতিটি বাঁক ও মোড়ে মমতার আর্থিক সহায়তার ছোঁয়া লেগে রয়েছে। ঘটনা হল, বাংলায় কেন্দ্রের বিরোধী দলের সরকার থাকায় রাজ্যকে বহু বাধা ও বঞ্চনার শিকার হতে হয় এবং হচ্ছে। বঞ্চনা কেন্দ্রীয় প্রকল্প থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব ক্ষেত্রেই। এই মুহূর্তে রাজ্যের ন্যায্য প্রাপ্য প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা আটকে রেখেছে কেন্দ্র। তবু রাজ্যের মানুষকে সুরাহা দিতে অক্লান্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সীমিত আর্থিক ক্ষমতা, কেন্দ্রের সীমাহীন বঞ্চনা এবং আগের বাম সরকারের দেনা মিটিয়েও রাজ্যের নানাবিধ পরিকাঠামো উন্নয়ন ও সমাজের সব অংশের মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ একদিনের জন্যও থেমে নেই। বহু বিতর্ক, সমালোচনা, বিদ্রুপ করেও শেষপর্যন্ত সেই মমতার ‘ম্যাজিক’ প্রকল্পগুলিকেই ‘রোল মডেল’ করে এগোতে চাইছে বিভিন্ন রাজ্যের বিজেপি সরকার। এখানেই মমতা সরকারের সাফল্য লুকিয়ে রয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, এই মুহূর্তে রাজ্যে কমবেশি ১০০টি প্রকল্প চলছে। রাজ্য বাজেটের একটা বড়ো অঙ্ক ব্যয় করা হচ্ছে এইসব প্রকল্পে। আর সবমিলিয়ে উপভোক্তার সংখ্যা প্রায় রাজ্যের মোট জনসংখ্যার সমান। যেমন, কর্মশ্রী প্রকল্পে বছরে ৭৫ দিন কাজ, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের প্রাপক ২ কোটি ২১ হাজার মহিলা, কন্যাশ্রীর সুবিধাভোগী ১ কোটি মেয়ে, স্বাস্থ্যসাথী ২ কোটি ৪৫ লক্ষ পরিবার, সবুজসাথী প্রকল্পে ১.৪৪ কোটি সাইকেল বিতরণ, পাকাবাড়ি ১ কোটি পরিবার, গ্রামীণ রাস্তা ১ কোটি ৮৩ লক্ষ কিলোমিটার। আবার এই আমলেই এ রাজ্যে দারিদ্রসীমার উপরে উঠেছে ১.৭২ কোটি মানুষ। নতুন চাকরি হয়েছে ২ কোটি। বেকারত্ব কমেছে ৪০ শতাংশ। কৃষিক্ষেত্রে উন্নতির হার ৯.১৬ গুণ বেড়েছে। 
দরজায় কড়া নাড়ছে আরও একটি নির্বাচন। এবার আর প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিজ্ঞা ঘোষণা। গত পনেরো বছরে উন্নয়নকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনার চেষ্টা হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাকে ‘স্বনির্ভর’ করে তোলার অঙ্গীকার করেছেন তৃণমূল নেত্রী। গত দেড় দশক বাংলা দেখেছে, সরকারের কাছে মানুষ নয়, বরং সরকারই পৌঁছে গিয়েছে মানুষের দুয়ারে। দুয়ারে সরকার, আমাদের পাড়া আমাদের সমাধান, সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী—এমন কর্মসূচির মাধ্যমে রাজ্যের প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছেছে সরকার। এই নির্বাচনে জিতলে সেই আদলে প্রতিটি ব্লক ও শহরে ‘দুয়ারে চিকিৎসা’ নামে শিবির করবে চতুর্থ তৃণমূল সরকার। বঙ্গবাসীকে সুস্বাস্থ্যের অধিকার দিতে মানুষের বাড়ির দরজায় স্বাস্থ্য পরিষেবা পৌঁছে দেওয়াই এবারে মমতার ‘মাস্টারস্ট্রোক’ হতে চলেছে। ‘দিদির ১০ প্রতিজ্ঞা’ নামে মমতার অঙ্গীকারের পাশাপাশি বলা হয়েছে প্রশাসনিক কাজের আরও বিকেন্দ্রীকরণ ঘটাতে নতুন সাতটি জেলা তৈরি করা হবে আগামী পাঁচ বছরে। আর ‘বাংলার শিক্ষায়তন’ প্রকল্পে প্রতিটি সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো ঢেলে সাজানো হবে। এজন্য শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। একথা ঠিক, ভোট এলে সব রাজনৈতিক দলই রকমারি প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু মমতা প্রমাণ করে দিয়েছেন, তিনি যা বলেন, তা করে দেখান। অতএব ফের জিতে ক্ষমতায় এলে ১০ প্রতিজ্ঞা পূরণ যে স্রেফ সময়ের অপেক্ষা থাকবে— তার গ্যারান্টি মমতা নিজে। তবে মনে রাখতে হবে, এটা মোদিজির বিখ্যাত ‘গ্যারান্টি’ নয়। 

সম্পর্কিত সংবাদ