রঞ্জুগোপাল মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া: স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মৃতিবিজড়িত ছেন্দাপাথরকে ঘিরে পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য সরকার। সেই লক্ষ্যে ছেন্দাপাথরকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে বলে জানালেন রাজ্যের মন্ত্রী তথা রানিবাঁধের বিধায়ক ক্ষুদিরাম টুডু। মন্ত্রী বলেন, জঙ্গলমহলের ছেন্দাপাথরে শহিদ ক্ষুদিরাম বসু সহ অন্য বিপ্লবীদের পা পড়েছিল। ওই এলাকা ঘিরে মুকুটমণিপুর, ঝিলিমিলি, সুতান, তালবেড়িয়া, বড়দি পাহাড় সহ বিভিন্ন বেড়ানোর জায়গা নিয়ে আমি একটি পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছি। ছেন্দাপাথরে শহিদ ক্ষুদিরামের মূর্তি বসেছে। তাঁর নামাঙ্কিত একটি উদ্যানও সাজিয়ে তোলা হচ্ছে।
দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বাঁকুড়া জেলার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এই জেলার জল-জঙ্গলঘেরা বিভিন্ন প্রত্যন্ত এলাকা আত্মগোপনের জন্য বেছে নিতেন বিপ্লবীরা। ইংরেজদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জেলার বহু মানুষ দুঁদে বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন। বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, বোমা বাঁধা সহ বিভিন্ন গুপ্ত কাজকর্ম চলত। জনশ্রুতি অনুযায়ী, রানিবাঁধ ব্লকের ঝিলিমিলির জঙ্গলের গুহায় ক্ষুদিরাম বসু, প্রফুল্ল চাকি, বারীন ঘোষের মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেসময় অম্বিকানগর রাজপরিবারের সদ্যসরা বিপ্লবীদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। রাজবাড়ির সদস্য রাইচরণ ধবলদেব স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। রাজবাড়ির সদস্যদের নির্দেশে বিপ্লবীদের আস্তানায় জল, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগান দেওয়া হত।
স্বাধীনতার আগে জঙ্গলমহলের বিভিন্ন জনপদ দুর্গম ছিল। তাছাড়া, ব্রিটিশরা এখানে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ভয় পেত। ফলে বিপ্লবীদের পক্ষে জঙ্গলমহল অনেকটা নিরাপদ আশ্রয় ছিল। বিশেষত, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া ও ঝাড়গ্রামের সংযোগস্থলে থাকা ঝিলিমিলি এলাকা বিপ্লবীদের অন্যতম পছন্দের স্থান ছিল। ওই সময় কোন কোন বিপ্লবী সেখানে আত্মগোপন করেছিলেন-তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু যে জেলায় পা রেখেছিলেন, তা অনেকেই গবেষণা করে জেনেছেন। ইতিহাসবিদরা জানান, ১৯০৮ সালের আগস্টে ফাঁসির মঞ্চে ওঠার কিছুদিন আগেই তিনি ঝিলিমিলি ঘুরে গিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদরা জানান, ক্ষুদিরাম সহ অন্য বিপ্লবীরা পাহাড়ের গুহায় থাকতেন। রাতের দিকে কখনও কখনও তাঁরা রাজবাড়ি ও আশপাশের এলাকায় যেতেন। ঝিলিমিলির ছেন্দাপাথরের গুহার মধ্যেই তাঁরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ, বোমা বাঁধার কাজ সারতেন। বিশেষ এক ধরনের বোমাও এই ডেরায় তৈরি হত। তা দিয়ে পরবর্তীকালে বহু ইংরেজকে নিকেশ করা হয়।
কয়েকবছর আগে স্থানীয় পঞ্চায়েত সমিতি তথা প্রশাসনের উদ্যোগে ছেন্দাপাথরে বিপ্লবী ক্ষুদিরামের মূর্তি, শহীদ বেদি, উদ্যান প্রভৃতি তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা জানান, ওই এলাকা আরও কিছুটা সাজিয়ে পর্যটনকেন্দ্র করা যেতে পারে। এমনিতেই বাঁকুড়া শহর থেকে ৮০কিমি দূরে ঝিলিমিলির নিসর্গশোভা দেখার মতো। পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে গড়ে উঠলে এলাকার অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। তবে ঝিলিমিলির বেশিরভাগ জমি বনদপ্তরের। তাই পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার আগে বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধিও প্রয়োজন।
বাঁকুড়ার জেলাশাসক অনীশ দাশগুপ্ত বলেন, ঝিলিমিলি, সুতান, মুকুটমণিপুর ঘিরে একটি পর্যটন হাব গড়ে তোলা যেতে পারে। পর্যটকদের কাছে বাঁকুড়ার জঙ্গলমহলকে আকর্ষণীয় করে তুলতে আমরা উদ্যোগী হচ্ছি।