


বিশেষ নিবন্ধ, ড. সায়ন্তন মজুমদার: আমরা জানি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির বিখ্যাত ‘দ্য লাস্ট সাপার’ ছবির কথা। যিশুর তেরো-তম শিষ্য জুডাস বিশ্বাসঘাতকতা করে তাঁকে শত্রুপক্ষের কাছে চিনিয়ে দেয়। সে কথা অবশ্য আগে থেকেই যিশু জানতেন। রাষ্ট্র ও ধর্মদ্রোহে অভিযুক্ত হয়েও দুই রাজা পিলাত ও হিরোদ কিন্তু যিশুর কোনো দোষ প্রমাণ করতে পারেননি। রাজা তাঁকে ছেড়ে দিতে চাইলেও পারিপার্শ্বিক লোকজনের চেঁচামেচি ও জোরাজুরিতে শেষে ক্রুশে দিতে বাধ্য হন। সময়টা আজ থেকে প্রায় দুই হাজার বছর আগে। আনুমানিক ৩০ বা ৩৩ খ্রিস্টাব্দ। এক শুক্রবারেই তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। মনে পড়ে যায় ১৯৩৯ সালে যিশুর জন্মদিনে লেখা মৃত্যুঞ্জয়ী খ্রিস্ট সম্পর্কে বাংলার বিশ্বকবির গান, ‘একদিন যারা মেরেছিল তাঁরে গিয়ে/ রাজার দোহাই দিয়ে’। যথার্থ ঈশ্বরপুত্রের মতোই তাঁর মৃত্যু হিংসার উপর প্রেমের জয়কে সুনিশ্চিত করেছিল। পরস্পর শত্রু ওই দুই রাজা বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন।
আসি সেই গুড ফ্রাইডের কথায়। বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্টের ম্যাথিউ, মার্ক, লুক, জনের সমাচার হতে সে সব কথা জানা যায়। সেদিন সৈন্যদের সঙ্গে রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় অনেকেই যিশুকে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন করতে ছাড়েননি। তবে সাইমন তাঁর ক্রুশ পিছন পিছন বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। শেষে গলগথায় করোটি নামক স্থানে দুই পাশে দুই অপরাধীর সঙ্গে তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়। শেষ কথায় তিনি বলেন, ‘পিতা তুমি এদের ক্ষমা করো। এরা জানে না যে এরা কী করছে?’ কাঁটার মুকুট পরা যিশুর মাথার উপরে খোদাই করে দেওয়া হয় INRI অর্থাৎ ইহুদিদের রাজা। দুপাশে টাঙানো দুইজনের একজন তাঁকে ব্যঙ্গ করে ঈশ্বরপুত্রের জোরে নিজেকে ও তাদেরকে বাঁচাতে বলে। আর একজন অবশ্য ভক্তিতে যিশুকে মেনে তাঁর অনুগামী হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি তখনই তাকে স্বর্গে সঙ্গে নিয়ে যাবেন বলেন।
দুপুরবেলায় গ্রহণের মতো ভরা অন্ধকারের মধ্যে চিৎকার করে জগৎপিতার কাছে তাঁকে পরিত্যাগের কারণ জিজ্ঞাসা করেন যিশু। তারপরে তাঁর হাতেই নিজেকে সমর্পণ করে অনন্তলোকে যাত্রা করেন। ঠিক তখনই প্রার্থনাঘরের পর্দা ছিঁড়ে যায়, ভূমিকম্প হয়। জনের মতে সেই সময় মা মেরি সহ আরো কয়েকজন মহিলাকে তিনি দেখতে পান। তাদের দেওয়া পানীয় সির্কার মাধ্যমে পিপাসা মেটান। সৈন্যরা বুঝতে পেরেছিল যে তিনি নির্দোষ ছিলেন। একজন মহাত্মার মতোই তিনি পরস্পর বৈপরীত্যগুলির মধ্যে সমতাবিধান করতে পেরেছিলেন।
যাই হোক, দৈত্যকুলে প্রহ্লাদের মতো যিশুর শত্রুপক্ষের একজন সৎ ব্যক্তি জোসেফ, রাজার সম্মতিতে যিশুর শবকে ক্রুশ থেকে নামিয়ে কাপড় জড়িয়ে পাথরের কবরে সমাধিস্থ করেন। তাঁর দেহে সুগন্ধি মশলা-মলম লাগিয়ে দেন মহিলারা। অন্য মতে, কবরে পুরোহিতরা পাহারাদার বসায়। জনের মতে, ঘটনাটি ঘটেছিল বিশ্রামবার বা ইস্টার শনিবারে। ক্রুশ থেকে নামানোর সময় এক সৈন্য তাঁকে নাকি বর্শার খোঁচাও দিয়েছিলেন!
‘যীশুর কবর হইয়াছিল, কিন্তু তিনি তৃতীয় দিবসে পুনরুত্থিত হয়েন এবং চল্লিশ দিনের পর স্বর্গারোহণ করেন। তিনি এখনও সেখানে আছেন। তাঁর মৃত্যু নাই। তিনি ভক্ত লোকদের নিমিত্তে প্রার্থনা করিয়া থাকেন।’—কথাগুলি লেখা হয়েছিল ১৮৬০ সালে প্রকাশিত বাংলার প্রথম শিশুকিশোরদের জন্য প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা ‘সত্যপ্রদীপ’-এ। ‘যীশুর মৃত্যু’ নামের সেই নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল পত্রিকার দ্বিতীয় খণ্ডের সপ্তম সংখ্যায়। কাজেই আসা যাক সেই ইস্টার রবিবার অর্থাৎ যিশুর রেজারেকশন বা পুনরুত্থান দিবসে। সকালবেলায় মহিলারা গিয়ে দেখেন সমাধির পাথরটা সরে গিয়েছে, কিন্তু যিশু সেখানে নেই। হঠাৎ দুইজন বা একজন সাদা কাপড় পরা লোক বা দেবদূত এসে তাঁদের বলেন জীবিত যিশুকে মৃতদের জায়গায় আর পাওয়া যাবে না। এখানেই যেন স্বামী বিবেকানন্দের বিশ্বাস মিলে যায়। তিনি বারবার বলতেন যে খ্রিস্ট কখনোই ক্রুশবিদ্ধ হননি। এক মরীচিকাকে, এক ভ্রান্তিকে টাঙানো হয়েছিল। তাঁকে কেউ হত্যা করতে পারেনি। যাই হোক মহিলাদের কিন্তু পরে দেখা দিয়েছিলেন যিশু।
লুকের মতে, ঠিক সেই দিনেই জেরুজালেম থেকে সাত মাইল দূরে ইম্মাউস গ্রামে দুই জন শিষ্যসহ যিশুকে হাঁটতে ও কথা বলতে দেখা যায়। সন্ধ্যাবেলায় এক গ্রামের একটি ঘরে ঢুকে, ঠিক জীবৎকালের মতোই রুটি ভাগ করে তাঁদের সঙ্গে খান তিনি। তারপরেই অন্তর্ধান করেন। তখন সেই দুইজন জেরুজালেমে ফিরে এসে বাকি শিষ্যদের সে কথা জানান। ঠিক তখনই যিশু আবির্ভূত হয়ে তাঁদেরকে অভিনন্দিত করেন। প্রথমে অশরীরী ভেবে ভয় পেলেও নিজের হাত-পা দেখিয়ে যিশু তাঁদের ভয় ভাঙান। নিজে থেকে চেয়ে নিয়ে একটি মাছভাজাও খান। ঈশ্বরপ্রেরিতজনদের দুঃখময় জীবনসহ নানা বিষয়ে দেন প্রত্যাদেশ। পরে বেথনিয়া পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে গিয়ে অবশেষে হাত তুলে আশীর্বাদ দানের পরে ঈশ্বরলোকে চলে যান।
ম্যাথিউয়ের মতে গালীলের পাহাড়ে যিশু শিষ্যদের প্রত্যাদেশ দিয়েছিলেন। এই শৈলোপদেশকে বিবেকানন্দ জীবনের দিঙ্নির্দেশিকা তথা আধ্যাত্মিক দিক থেকে কল্যাণকারী বলে মনে করতেন। কারণ যিশু পুনরুজ্জীবনের পরে একটা কথা বারবার বলেছেন, তোমাদের শান্তি হোক। তার সঙ্গে পূর্বোক্ত সত্যপ্রদীপ পত্রিকায় ‘খ্রীস্ট দত্ত শেষ আজ্ঞা’-য় লেখা হয়েছিল বিশ্বাস স্থাপনের কথা।
সেই সবিশ্বাস শান্তি পেতে আমাদের আজও বারবার করে ফিরে যেতে হয় যিশুর কাছেই। কারণ সেই ঈশ্বরপুত্রের ইহজগতের জন্য আত্মদান আজও শেষ হয়নি। তার প্রমাণ আজও বহন করছে রবীন্দ্রনাথের ‘মানবপুত্র’ কবিতাটি। ১৯৩২ সালের শ্রাবণ মাসে রচিত এই কবিতাটি পরে ‘পুনশ্চ’ কাব্যভুক্ত হয়। গদ্য-ছন্দে লেখা বলে সহজেই গল্পটি পড়া মাত্রই বোঝা যায়। মৃত্যুপাত্রে নিজের মৃত্যুহীন প্রাণ উৎসর্গ করে নিত্যধাম থেকে একদিন মর্তপৃথিবীর দিকে তাকালেন যিশু। সেকালের মতো একালেও তিনি পাপশেল ও নানা শাণিত অস্ত্রে জর্জরিত মানবাত্মাকে পরিলক্ষ করেন। এমনকি এখানে থাকা নানা অস্ত্রের গায়ে নখের আঁচড়ে লেখা তাঁর নিজের নামও দেখতে পেলেন। যা দেখে বেদনায় বুকে হাত দিতে বাধ্য হন তিনি। তাঁর ঘাতকরাই যেন আজ নবজন্ম লাভ করে ‘মারো, মারো’ শব্দের স্তবমন্ত্র আওড়াচ্ছে। কবিতাটি কবি শেষ করেছেন যিশুর জবানিতেই—‘হে ঈশ্বর, হে মানুষের ঈশ্বর/কেন আমাকে ত্যাগ করলে।’
এই ইস্টার রবিবার কেন সকলের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়? আসলে এই দিনেও বড়োদিনের সান্টাক্লসের উপহারের মতো ভালো কাজের স্বীকৃতিরূপে পাওয়া যায় বেশ কিছু ডিম। তা আসল ডিম নাও হতে পারে, চকলেটের ডিমও হয়। সেগুলি আবার হয় নানা রঙের। এখন প্রশ্ন, ডিমই কেন? ডিম নবজন্মের প্রতীক আর রং বসন্তের। ভূগোলে ২১ মার্চ সম্পর্কে আমরা পড়েছি যে সেই তারিখে দিন-রাত্রি সমান হয়। দিনটিকে বসন্তবিষুবও বলা হয়। তারপরে আসা পূর্ণিমার পরের রবিবারটি হল ইস্টার রবিবার। বিশ্বের বহু দেশের পাশাপাশি সমগ্র ভারতে তথা বাংলায় সাড়ম্বরে পালিত হয় এই রবিবার, মেতে ওঠেন খ্রিস্টান সমাজ, আয়োজন করা হয় ভোজসভার। এই দিন থেকে শুরু হয়ে পঞ্চাশ দিন পরে এক রবিবারেই শেষ হয় ইস্টার উৎসব।
এক সময় এই ইস্টার সপ্তাহে বাংলার স্কুলেও ছুটি থাকত। সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘অনুবর্তন’(১৯৪২) উপন্যাসে লেখা রয়েছে, ‘চৈত্র মাস। ইস্টারের ছুটি আজই হইয়া গেল।’ বিভূতিবাবু শুধু ইস্টারের ছুটি নয়, ছুটি কাটানোর জন্য যেন চিরকালীন সঙ্গীরূপে ‘পথের পাঁচালী’-র অপুদুর্গাকেও আমাদের জুটিয়ে দিয়েছিলেন।
এই বছর ইস্টার রবিবারের দিন দশকের মধ্যেই পালিত হবে চড়ক উৎসব। আবার দিন পনেরো আগেই উদযাপিত হয়েছে ইদ। তিনটি ধর্মের তিনটি উৎসবকে, ১৯৫৯ সালের ২৭ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত চার দিন ধরে লেখা একটি কবিতার মধ্যে মধ্যে সম্মিলিত করেছিলেন কবি বিষ্ণু দে। সাত ভাগে বিভক্ত, ‘স্মৃতি সত্তা ভবিষ্যৎ’ কাব্যভুক্ত সেই ‘চড়ক ঈষ্টার ঈদের রোজা’ কবিতাটিতে ছিল মোট ১৯১টি ছত্র। চিত্রকর যামিনী রায়ের জন্মদিন(১১ এপ্রিল) উপলক্ষে লেখা সেই সৃষ্টিতে কবি লিখেছিলেন, ‘স্মৃতির প্রতাপ আর আশার স্পন্দন শত হাহাকারে/ ঈদের রোজায় আর চড়কের ব্রতে আর উপোসী ঈস্টারে।’ আজকের মতো সেই সময়েও কলকাতায় ‘পশ্চিমা রোদ্দুর’-এ বেশ গরম ছিল, মাঝে মাঝে কালবৈশাখীর দাপটও দেখা যাচ্ছিল। ঠান্ডার সন্ধ্যায় কবি ছায়ায় ছায়ায় শুধু হত্যার রোদ্দুর দেখছিলেন। অথচ ইস্টার আসে। কবি পশ্চিমের কারো কারো হৃদয়বত্তায় ইস্টারকে আসতে লক্ষ করেন, চৈতালী অশ্রুতে বাজতে থাকা মানবিক উজ্জীবিত সুর শুনতে পান। মাতা মেরির করুণ বাহুতে ‘নূতন মানুষ’ যিশুকে দেখতে পান। কবির মতে, তাঁর কারণেই ‘আবিশ্ব নয়নে’ আসে ‘মমতার অশ্রুর প্রণতি’, ইস্টার তারই বাহক। লেখক প্রাবন্ধিক ও গবেষক