Bartaman Logo
১০ জুন, ২০২৬
বর্তমান / সম্পাদকীয়

ছোটো ছোটো জিনিসের দেবী

মনে হতে পারে খুবই ছোটো ছোটো, তবে এগুলোই হল প্রকৃত উন্নয়ন। নরেন্দ্র মোদি বাংলার মানুষের সঙ্গে বঞ্চনা, প্রতারণার রেকর্ড গড়েছেন।

ছোটো ছোটো জিনিসের দেবী
  • ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০৪:০০
Prefer us on Google

হারাধন চৌধুরী: এক। এমাসের ১৩ তারিখের কাগজে ভিতরের পাতায় একটা খবরের শিরোনোম: ‘‘ছোটোখাটো আগুন নেভাতে কলোনিতে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ’’। খবরটির নির্যাস হল, বাগবাজার অঞ্চলের পুর কাউন্সিলার কয়েকবছর আগে সেখানকার চারটি বড়ো বস্তিতে আধুনিক অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র বসাবার ব্যবস্থা করেছেন। শুধু মেশিন বসিয়েই দায় সারা হয়নি, সেগুলি নিয়মমাফিক রিনিউ করা হয় এবং যন্ত্র ব্যবহারের ট্রেনিংও দেওয়া হয়েছে স্থানীয় যুবদের। ইতিমধ্যে একাধিকবার সুফল পেয়েছে ওই এলাকা। আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে তা নিয়ন্ত্রণে এনেছেন বাসিন্দারাই। ফলে সম্ভাব্য বড়ো বিপদ এবং ক্ষয়ক্ষতি রুখে দেওয়া গিয়েছে। 

Advertisement

দুই। আর একটা খবরের শিরোনাম নজর কাড়ে: ‘‘এবার বাংলার বাড়ি ৩৩ হাজার মহিলাকে’’। এই খবরের মোদ্দা কথা—শীঘ্রই বাংলার ৩৩ হাজার গরিব মহিলাকে বাংলার বাড়ি প্রকল্পের অধীনে মাথার উপর পাকাছাদের বন্দোবস্ত করছে নবান্ন। দুই কিস্তিতে দেওয়া হবে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা। উপভোক্তা যাচাই করেই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তির টাকা পাঠানো হবে। মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিধবা কিংবা স্বামী পরিত্যক্ত মহিলারা অগ্রাধিকার পাবেন। আবাস যোজনায় কেন্দ্রীয় বঞ্চনার জবাব এভাবেই দিচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পঞ্চায়েত দপ্তর। 
তিন। গতমাসের গোড়ার দিকে পাঠক পড়েছেন ‘‘স্বপ্নের গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাস মমতার হাতে, তিনবছরের মধ্যেই নির্মাণের টার্গেট’’। গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণ এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। বহুচর্চিত ও বহুপ্রতীক্ষিত এই দীর্ঘ সেতুর শিলান্যাস হল ৫ জানুয়ারি। এই নির্মাণ দ্রুত শেষ হবে বলেই আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সবাই জানে এটি জননেত্রীর একটি স্বপ্নের প্রকল্প। শিলান্যাস করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘গঙ্গাসাগর সেতু তৈরি হয়ে গেলে আমি শান্তি পাব। কারণ, মেলা চলাকালীন একটু চিন্তায় থাকি। দীর্ঘ জলপথ পারাপারে চিন্তা থেকেই যায়। কখন যে কী ঘটে! সেতু হয়ে গেলে চিন্তাটা আর থাকবে না।’’ তাঁর ঘোষণা, ‘‘এই ব্রিজ রাজ্যের অর্থে রাজ্যই তৈরি করবে। পাঁচবছর নয়, দু-তিন বছরের মধ্যেই সবটা হয়ে যাবে।’’ 
মুখ্যমন্ত্রীর এই স্বস্তির কারণ, গঙ্গাসাগরের ইতিহাস মোটেই স্বস্তিদায়ক নয়। পুরাণপ্রসিদ্ধ সাগরদ্বীপ দীর্ঘকাল পাণ্ডব-বর্জিত এক দেশ ছিল। আর প্রাচীনকাল থেকে সেখানেই ভগবান কপিল মুনির টানে পুণ্যকামী নরনারীর যাতায়াত। তবে পুরানো দিনে খুব কম মানুষেরই পক্ষে সাগরদর্শন সেরে ঘরে ফেরা সম্ভব হত। ওই সূত্রেই ‘সব তীর্থ বারবার গঙ্গাসাগর একবার’ প্রবাদের জন্ম। অনেকের মনে থাকবে, ১৯৯৪ সালে মেলা শেষ হওয়ার পরদিন, ঘরমুখো পুণ্যার্থীদের ‘মা অভয়া’ লঞ্চ ডুবির বিভীষিকাময় স্মৃতি। প্রায় দেড়শো মানুষের সলিল সমাধি হয়েছিল! পরবর্তীকালে যাতায়াত ব্যবস্থা এবং মেলা ম্যানেজমেন্টের কিছু উন্নতি হওয়ার পরেও রকমারি দুর্ঘটনা, দুর্ভাগ্য পিছু ছাড়েনি। 
এবার পূর্ণকুম্ভ ছিল না। ফলে মকরসংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগরে রেকর্ড তীর্থযাত্রীর সমাগম হয়েছিল। আর রাজ্য সরকারের সাফল্য সেখানেই—কোনো বড়ো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই এবং দূষণ রুখে সাঙ্গ হয়েছে মেলা। এই সাফল্য কত বড়ো, তা বুঝতে গতবছর অনুষ্ঠিত প্রয়াগকুম্ভের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান পাশে রাখা দরকার। ২৯ জানুয়ারি পদপিষ্ট হয়ে ৩০ জন নিহত এবং ৬০-৭০ জন গুরুতর জখম হন। রেল স্টেশনে এবং সড়ক দুর্ঘটনাতেও হতাহত হন বহু মানুষ। এছাড়া একদিন গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে ৫০টির বেশি তাঁবু ভস্মীভূত হয়। প্রয়াগে মাত্রা ছাড়ায় নদীদূষণ। 
ভাগ্যান্বেষী মানুষের অসীম সাহসে সাগরদ্বীপে গড়ে উঠেছে ঘন বসতিও। এখন তো দেশ-বিদেশের লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী এবং পর্যটক সেখানে যান। সাগরদর্শন এখন আর মকরসংক্রান্তির পর্বে আটকে নেই, সংবৎসরের ব্যাপার। যে-বছর পূর্ণকুম্ভ মেলা হয় না, সে-বছর মকরসংক্রান্তিতে গঙ্গাসাগর মেলা ব্যাপক আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তাই জাতীয় মেলার স্বীকৃতি চাওয়া হচ্ছে বহুবছর যাবৎ। একইসঙ্গে দাবি ছিল গঙ্গাসাগর সেতু নির্মাণের। কারণ এই সেতু শুধু পুণ্যার্থী এবং পর্যটকদের সুবিধা দেবে না, সাগরকে কেন্দ্র করে সুন্দরবন অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ অবহেলিত মানুষের জীবন-জীবিকার মানও পালটে দেবে দ্রুত। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ন্যূনতম সময়ে ত্রাণ পাঠাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে এই সেতু। কিন্তু মোদি সরকার বাংলার দাবি কানেই তোলেনি। অতএব পুরো দায়িত্ব মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই স্বীকার করতে হয়েছে। কোনো সংশয় না রেখেই বলব, স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সোনার কাঠি হতে চলেছে মমতার সেতুটি।
চার। ৫ জানুয়ারি শুধু দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেই আরও একাধিক প্রকল্পের সূচনা হয় মমতার হাতে। সেগুলির জন্য রাজ্য একাই খরচ করল ২,৩২৪ কোটি টাকার অধিক। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য—গদখালি থেকে গোসাবা পর্যন্ত রোরো জেটি। তার ফলে পর্যটকরা কলকাতা থেকে গাড়ি নিয়ে সরাসরি পাখিরালয় যেতে পারবেন। আগে গদখালি ঘাটে গাড়ি রেখে নৌকায় নদী পেরিয়ে যেতে হত, সেই ঝক্কির দিন গত হল। বাসন্তী, পাথরপ্রতিমা, গোসাবাসহ সুন্দরবনের কয়েকটি স্থানের জন্য জেটির ভার্চুয়াল উদ্বোধন হয় সেদিন। পাশাপাশি সোনারপুর গ্রামীণ হাসপাতালে ১২০ শয্যার নতুন ভবনেরও শিলান্যাস করেন জননেত্রী। বহু রাস্তা, টিউবওয়েল এবং অঙ্গনওয়ারি কেন্দ্রের উন্নয়নমূলক বিবিধ কাজেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয় তাঁর হাতে।
পাঁচ।  এবার বাড়ছে সবুজসাথীতে উপভোক্তার সংখ্যা—১২ লক্ষ ৪৭ হাজার স্কুলপড়ুয়া সাইকেল পাবে। ছেলেমেয়ের অনুপাত হতে চলেছে সমান সমান। সবুজসাথী ২০১৫-১৬ সালে চালু হয়। এপর্যন্ত ১.৩৮ কোটি সাইকেল দেওয়া হয়েছে। কন্যাশ্রীর মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প দুটি, পাশাপাশি মিড ডে মিল স্কুলছুট কমাতে বিরাট ভূমিকা পালন করে। 
ছয়। শীঘ্রই চালু হয়ে যাচ্ছে ‘যুবসাথী’। উপভোক্তারা প্রতিমাসে দেড় হাজার টাকা পাবেন। আগস্ট পর্যন্তও অপেক্ষা করতে হবে না তাঁদের। মাধ্যমিক উত্তীর্ণ ২১-৪০ বছর বয়সি যুবক-যুবতীরা প্রাথমিকভাবে সর্বোচ্চ পাঁচবছর অথবা কর্মসংস্থান না-হওয়া পর্যন্ত এই আর্থিক সহায়তা পাবেন। পাঁচবছর পর রিভিউ করে দেখা হবে, সংশ্লিষ্ট উপভোক্তার তখনো এই প্রকল্পের সুবিধা পাওয়া উচিত কি না। অন্তর্বর্তী বাজেটে যুবসাথীর সঙ্গে আরও দুটি প্রকল্প ঘোষিত হয়েছে। সেটি বস্তুত কৃষকদের জন্য জোড়া উপহার। একটি হল ভূমিহীন খেতমজুরদের জন্য ভাতা এবং সেচের খরচ মকুব। বার্ষিক চার হাজার টাকা হারে ভাতা পাবেন গরিব খেতমজুররা। ওই টাকা দেওয়া হবে মোট দুটি কিস্তিতে। অন্যদিকে, দু-হাজার টাকা পর্যন্ত সেচের খরচ মকুব করা হবে। সরকারি নলকূপ বা রিভার লিফট ইরিগেশন প্রকল্পে এই সহায়তা মিলবে। এবারের রাজ্য বাজেটের সবচেয়ে আকর্ষক বিষয় নিঃসন্দেহে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের অনুদান বৃদ্ধি। এই পুরানো প্রকল্পের বর্ধিত পাঁচশো টাকা ফেব্রুয়ারি থেকেই দেওয়া শুরু হয়েছে। যুবসাথী এবং খেতমজুরদের ভাতা চালু হবে ১ এপ্রিল। সম্ভবত, নিন্দুকদের কটাক্ষের কথা মাথায় রেখেই মুখ্যমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন, পয়লা এপ্রিল দিনটা ‘এপ্রিল ফুল’ নামক মশকরা করা হয়ে থাকে। সংশ্লিষ্ট সকলকে আশ্বস্ত করে তিনি যোগ করেন, ‘‘আমরা কিন্তু এপ্রিল ফুল করছি না।’’ অবশ্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনমুখী রাজনীতি এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রশাসন পরিচালনা সম্পর্কে যাঁদের ন্যূনতম ধারণা আছে, তাঁরা জানেন, তাঁর এই পাদটীকা বাহুল্য। তিনি আলাদাভাবে আশ্বস্ত না করলেও কেউ তাঁকে অবিশ্বাস করত না। কারণ তাঁর রাজনীতি এবং সরকারের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল কথা দিয়ে কথা রাখা। 
***
মনে হতে পারে খুবই ছোটো ছোটো, তবে এগুলোই হল প্রকৃত উন্নয়ন। 
নরেন্দ্র মোদি বাংলার মানুষের সঙ্গে বঞ্চনা, প্রতারণার রেকর্ড গড়েছেন। পাশাপাশি ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মোড়কে তিনি নত হয়েছেন ট্রাম্প সাহেবের কাছে। আর মমতা মাথা উঁচু করে গরিবের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাতে একদিকে ধরা পড়ে গিয়েছে সংঘের ‘স্বদেশি’ ও ‘আত্মনির্ভর’ ভারতের কঙ্কালসার চেহারা, অন্যদিকে উজ্জ্বল হয়েছে প্রকৃত উন্নয়নে মমতার চারিত্রিক দৃঢ়তা। কায়েমি স্বার্থের শত বিরোধিতা, কুৎসা, মিথ্যাচার, ষড়যন্ত্র তাঁকে থামাতে পারেনি। স্বামী বিবেকানন্দ, গান্ধীজি ও নেতাজির স্বপ্ন সাকার করার পথে পা রেখে এগোচ্ছে মমতার বিকল্প অর্থনীতির সংজ্ঞা। জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের অর্থমন্ত্রীরা—অশোক মিত্র, অসীম দাশগুপ্তও বিকল্প অর্থনীতির কথা বলতেন বটে, কিন্তু বাস্তবে ধনতন্ত্রের জুতো থেকে পা বের করতে সফল হননি তাঁরা। 
এসি বাস, বুলেট ট্রেন, ক্রুজ, সেভেন স্টার হোটেল, বৃহৎ শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু ওইসব যানবাহনে সওয়ার হওয়ার ভাড়া পকেটে থাকা জরুরি। ওইসব বিলাসবহুল হোটেলে থাকতেও মোটা অর্থ চাই। আধুনিক শিল্পের কর্মী হওয়ার জন্য চাই উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ। সোজা কথায়, সংগতি চাই সবার আগে। ছোটো ছোটো উন্নয়নই, একটু দেরিতে হলেও সাধারণ মানুষকে সমস্ত স্বপ্নপূরণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবে। ব্যাপারটা তৃষ্ণার্ত মানুষকে নদীর কাছে কিংবা মাটির গভীরে জলের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগের মতোই মহৎ। শাসককে হতে হবে দ্য গড অব স্মল থিংস।‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেইসব ছোটো ছোটো জিনিসের (পড়ুন, উন্নয়নের) সাক্ষাৎ দেবী।

Advertisement
সম্পর্কিত সংবাদ