সংবাদদাতা, কাটোয়া: পাথরের তৈরি অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তিকেই কালীরূপে পুজো করা হয় কাটোয়ার কালিকাপুর গ্রামে। বছরভর ওই মূর্তিকেই ‘জয়দুর্গা’ জ্ঞানে পুজো করা হলেও কার্তিকের দীপান্বিতা অমাবস্যায় মহিষাসুর মর্দিনীই কালীরূপে পূজিতহন। এমনকী, ওই দেবীর নামানুসারেই নাকি তামাম গ্রামের নামকরণ কালিকাপুর করা হয়েছে। গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর কয়েক শতাব্দী ধরে নানারূপে পুজো হয়ে আসছে। গোটা গ্রাম কালীপুজোর দিন উৎসবে মাতোয়ারা হয়।
কাটোয়া-২ ব্লকের অগ্রদ্বীপ পঞ্চায়েতের কালিকাপুর গ্রামে বছরের পর ধরে মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তিকে কালী রূপে পুজো করা হয়ে আসছে। কার হাত ধরে কবে এই পুজো শুরু হয়, কেউ বলতে পারেন না। রয়েছে নানা জনশ্রুতি। শোনা যায় কালিকাপুর গ্রামের পাশেই কুমরি নামের এক গ্রাম রয়েছে। এই গ্রামের পাশ দিয়েই বয়ে গিয়েছে ‘কুমরির বিল’। ওই কুমরি গ্রামেরএক ব্রাহ্মণ নাকি বহুকাল আগে দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। দেবী তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়ে বলেন, কুমরির জল থেকে তাঁকে উদ্ধার করে গ্রামে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কিন্তু ব্রাহ্মণ দেবীর সেই স্বপ্নাদেশকে তখন গুরুত্ব দেননি। এরপর কালিকাপুর গ্রামের আরেক পূজারী ব্রাহ্মণ স্বপ্নাদেশ পেয়ে ‘কুমরির বিল’ থেকেই পাথরের মায়ের মূর্তি তুলে এনে নিজের গ্রাম কালিকাপুরে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর থেকেই এই মূর্তির পুজো হয়ে আসছে। মূর্তিটি কবে তৈরি তার কোনও তথ্য মেলেনি। তবে মূর্তির গঠনশৈলী দেখে সংশ্লিষ্ট মহলের অনুমান, এটি পাল-সেন যুগের সমসাময়িক হতে পারে। পাল যুগের পাথরের তৈরি মূর্তিগুলির সঙ্গে এই দেবীমূর্তির সাদৃশ্য রয়েছে।
যদিও গ্রামের বাসিন্দাদের একাংশের মতে, বর্তমানে যেটাই কুমরি বিল আদতে তা সপ্তমাতৃকার এক মাতৃকা কৌমারী নদী। কৌমারী নদীর তীরেই এক সময় নাকি এই মূর্তির পুজো হতো। কালের নিয়মে মন্দিরএকসময় ধ্বংসপ্রাপ্তহয়। তারপর নদীর মধ্যেই পরে ছিল মায়েরমহিষমর্দিনী মূর্তি। অনেক পরে অষ্টাদশ শতকের প্রথমে কালিকাপুরের তৎকালীন জমিদার উদ্ধার করে মূর্তিটি গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এরপর দেবীর নামেই গ্রামের নাম হয় ‘কালিকাপুর।’’
মন্দিরের সেবাইত রতন মুখোপাধ্যায়ের কথায়, আমরা বংশপরম্পরায় দেবীর পুজোকরে আসছি। কালিকাপুরে এই কালী ছাড়া অন্য কোনও কালীপুজো করার বিধি নেই।পাশের গ্রামেরকোনও কালীপুজোর শোভাযাত্রা কালিকাপুরে ঢোকার অনুমতিও নেই। পাশের কুমরি গ্রামের বাসিন্দারাও এই দেবী ছাড়া অন্য কালীমূর্তির পুজো করেন না। মাঘ মাসে কুমরি গ্রামে দেবীর বিশেষ পুজো হয়। রতনবাবুর সংযোজন, গ্রামের মহিলারা গঙ্গাস্নান সেরে কলসি করে জল এনে মন্দিরে সঞ্চয় করে রাখেন। দেবীর পুজোয় বিভিন্ন রকমের ভাজা, মুড়ি, চিঁড়ে, চালভাজা ইত্যাদি ভোগে নিবেদন করা হয়। -নিজস্ব চিত্র